বিনোদন

স্বপ্ন দর্পণ

প্রথম থেকে দ্বাদশ পর্বের লিংক

স্বপ্ন দর্পণ

 

তেরো

পারভেজকে অনুসরণ করে এসেছে এয়ারপোর্ট থেকে চৈতী। সেই কারনেই পারভেজকেই বেশ সাবধানে গাড়ি চালাতে হয়েছে। বারবার লুকিং গ্লাসে দেখতে হচ্ছিলো চৈতীর গাড়ির অবস্থান। কিন্তু “রাদেজসকি ব্রুখে”র কাছাকাছি আসতেই চৈতীর মাথায় দুষ্টবুদ্ধি কিলবিল করতে থাকে। সে পারভেজকে সামনে রেখে “রাদেতজসকি ব্রুখে”কে বামে রেখে ডানদিকে টার্ন নিয়ে “প্রাতা”র এর রাউন্ড এবাউট ধরে শর্টকাট রাস্তায় চলে আসে “গাছপালা”র নিজস্ব পার্কিংয়ে। যেখানে সাতটি গাড়ি ও অনায়াসে রাখবার ব্যবস্থা।

গাড়ী পার্ক করে নামতেই পারভেজের গাড়িকে পার্কিংয়ে ঢুকতে দেখে একগাল হাসি ছড়িয়ে দেয় চৈতী পারভেজের উদ্দেশ্যে।

পারভেজ:(গাড়ির জানালার কাঁচ নামিয়ে)
খালাম্মা, আবার আইসেন আমার গাড়ির পিছনে, এমুন ভুতুইরা জায়গায় নিয়া ছাড়ুম, খালি কাঁনবেন আর চিক্কার পারবেন!

চৈতী:
মামু নিজের বাড়ির শর্টকার্ট আমারে চিনাইয়া নিজেই ভুইল্লা গেলে আমার কি দুষ?

গাড়ি থেকে বাবু রাতুল অতুলকে নিয়ে নেমে দুই পাগলের মিশ্র ঢাকাইয়া শুনে নিজেও যোগ দিলো!

বাবু:
কি অইছে, খালা আর ভাইগ্নার চোপা চলবার লাগছে কেলা? আমরাভি ঢাকাইয়া মাত মাতবার পারি জানেমান!

বাবুর মুখে “জানেমান” শব্দটি শুনে চৈতীর ভেতরে এক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। কেমন এক শূন্যতা ছেঁয়ে গেলো সারাবুক জুড়ে! সুকুমার শ্রাবন্তী নেমে আসে পারভেজের মিউজিক ভ্যান থেকে!

সুকুমার:
চৈতী, তুই এখনো সেই চৈতীই রইয়া গেলি। একবার কি হয়েছিলো জানো পারভেজ?

পারভেজ:
না কইলে জানুম কেমনে? (একগাল হাসি দিয়ে)

সুকুমার:
আমরা এসএসসি পরীক্ষা শেষ করে ভাবছি কি করা যায়। তখন চৈতীর পরামর্শে একদিন আমরা নৌকা ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নিলাম। এক বিশাল ছৈ দেয়া নৌকা ঠিকঠাক করলো চৈতী নিজেই। কারণ সবক্ষেত্রেই এই পাগলীর এক বিশাল পরিচিতি শিমুলগঞ্জ জুড়ে। আমাদের নদীপথে ভ্রমনের মুখ্য মানুষ ছিলেন পরাণ কাকু। চৈতী প্রথমেই গেলো তার কাছে।

বেশ ঠান্ডা পরেছে সেইবার। খুব ভোরে বুলা এবং আসমাকে বগলদাবা করে চৈতী কান্তা নদীর শাখা যদি “শীতলা”য় যেখানে পরাণ মাঝি দিনের শেষে রাত্রি যাপন করে সেইখানে গিয়ে হাজির। বয়স হয়েছে পরাণ মাঝির এলাহী তালুকদার বহু চেষ্টা করেছে অন্তত রাত্রিটা তার জন্য নির্ধারিত ঘরটায় গিয়ে যেনো সে কাটায়। কিন্তু পারেনি চৈতীর নানাভাই পরাণ মাঝিকে ঘরে ফেরাতে।

কুয়াশায় পরাণ মাঝির নৌকা দেখা যাচ্ছিলোনা দূর থেকে। কাছে পৌঁছাতেই ওরা দেখে পরাণ মাঝি নৌকা নিয়ে খেয়া পারাপারের জন্য রওনা দিতে প্রস্তুত। তিনজনই বাকী পথটুকু শেষ করতে দৌড় লাগায়।

চৈতী:
ও পরাণ মামা, একটু থামো। আমি চৈতী!

বয়সের কারণে খুব একটা ভালো কানে শুনতে পায়না পরাণ মাঝি। কিন্ত এই মেয়েটির ডাক কি করে যেনো টের পায় সে। পরাণ মাঝি নৌকা আবার ঘাটে ভিরায়। ঝাপসা চোখে কুয়াশা ভেদ করে তিনকন্যাকে এমন ভোরে দেখে অবাক হলেও খুব একটা আশ্চর্য্য হয়না। চৈতী আছে যে সাথে!

পরাণ মাঝি:
কিরে মা জননীরা এই ভোরে কুয়াশার মধ্যে বাইর হইছো কেন?

আসমা:
মামা, তোমার চৈতীরে জিগাও। সেই কখন আইসা আমার জানলার কাছে দাঁড়াইয়া কোকিলের সুরে ডাইক্যা ঘুম ভাঙাইছে!

বুলা:
এই পাগলীর কারণে মামা একটু শান্তি কইরা ঘুমামু তার সুযোগ নাই। আমারে ডাকছে কুত্তার ডাক দিয়া। ভাগ্য ভালো মহারানীর সুকণ্ঠে কুত্তার ডাক ধরা খাইয়া যায়, নইলে বুঝতাম কেমনে এই বজ্জাত আমার ঘুম ভাঙাইতে আসছে!

চৈতী:
হইছে তোগোর অভিযোগের হিসাবনিকাশ শেষ হইছে? তোরা ভালো কইরা জানস কেন আইছি। হ’ একটু পরিকল্পনায় পরিবর্তন করছি। পরাণ মামার সাথে আমিই কথা কমু কথা আছিলো, কিন্তু তোদের ছাড়া আমি কোনো কাম একা করছি?

আসমা:
তাইলে আর চাইর বান্দররে ডাইক্যা আনলিনা কেন?

বুলা:
ঠিক কথা, ঐ চ্যাংড়া গুলারেও ঘুম থেইক্যা তুইলা আনতি।

চৈতী:
হ’ এইডা ভুল হইছে। এইনে কানে হাত!

পরাণ মাঝি:
থাকুক সব অভিযোগ, আমার এই চুলবুলি মায় তোমাদের বড় ভালবাসে। কও জননী কেন এতো ভোরে আমার কাছে আসছো?

চৈতী:
মামা, আমি ঠিক করছি আগামী পরশু নৌকা ভ্রমনে যামু। কিন্তু তোমার নৌকায় হইবোনা। আরো একটা বড় নৌকা চাই। তুমি থাকবা সাথে। সেইদিন তোমার কাজ বন্ধ।

পরাণ মাঝি:
কাকুরে (এলাহী তালুকদার) কইয়া তোমাদের নাও নিলে হয়না মা?

চৈতী:
হ’ তাইলে তাই ঠিক হইলো। তুমি কইবা না আমি কমু? (একটু ভেবে নিয়ে) না তুমিই কইবা। তোমারে নানাভাই খুব ভালবাসে!

পরাণ মাঝি:
পাগলী একটা, বড় হইছো, এখন একটু দুষ্টামি বুদ্ধি ছাড়ো!

চৈতী:
তুমি বলছো যাও ছাইড়া দিমু, কিন্তু পিকনিকের দিন আমার শেষ কথা রাখবা এই দুই চিপা শয়তানের সামনে কথা দাও।

পরাণ মাঝি:
হায় ভগবান!! কি কথা???

চৈতী:
এখন কওন যাইবোন। ঐ দিন কমু, তুমি শুনবা!

পরাণ মাঝি:
মন্দ কিছু কইলে তোমার বুড়া ছাওয়াল শুনবোনা কইয়া দিলাম।

চৈতী, আসমা, বুলা পরাণ মাঝির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলো।

বুলা:
ঐ তুই আমাগোরে চিপা শয়তান কইলি কেন ঐ সময়?

আসমা:
ঠিক, কি কারনে আমরা তোর কাছে চিপা শয়তান কইয়া তারপরে বাড়ি যাবি।

চৈতী:
আমি এখন বাড়ি যামু কে কইলো তোগোরে?

বুলা:
তাইলে কই যাবি যা, আমরা তোর লগে যামুনা।

চৈতী:
ঠিক আছে আমার লগে যাইতে হইবোনা। তোগোর লগে আমি যামু!

আসমা:
এক্কেরে বেহাইয়া একটা!

চৈতী:
চিপা শয়তানদের সাথে থাকলে যে কেউ বেহায়া হইতে বাধ্য!

তিন বান্ধবী এভাবেই তর্ক করে এগিয়ে যাচ্ছিলো। কুয়াশা ক্রমশ আরো বেশি ঘন হতে শুরু করেছে। সূর্য্যের কোনো পাত্তাই নেই আজকের কুয়াশার কাছে। বুলাদের বাড়ির কাছে আসতেই চৈতী শক্ত করে আসমার হাত চেপে ধরলো।

আসমা:
কিরে আমার হাত ছাড়, পিরিত দেখাইতে হইবোনা, ছাড় আমার হাত।

চৈতী আরোবেশি শক্ত করে চেপে ধরে চৈতীর হাত।

বুলা:
আসমা আমি গেলাম। এগারোটায় আব্বা যাইতে কইছে।

বুলা বাড়িতে ঢুকবার আগেই অরু আসমার হাত ধরে ঢুকে পরে বুলাদের বাড়িতে। উঠোন পেরিয়ে দালান সামনে রেখে ডানদিকে সোজা রান্না ঘরে চলে যায় চৈতী আসমাকে নিয়ে। হুড়মুড় করে চৈতীকে অসমার হাত ধরে ঢুকতে দেখে বুলার মা শিলা শেখ একটুও অবাক হননা। তার কাছে বুলার চাইতে বেশী পরিচিত চৈতী, তারপর আসমা। তবে এই মুহূর্তে চৈতীর পাগলামী মুখ্য বিষয় তার বুঝতে একটুও বেগ পেতে হয়না।

চৈতী:
খালাম্মা, রসের জাউ কই? আমার এখন রসের জাউ ছাড়া চলবেনা। কিরে আসমা তোর চলবে?

ওদের পেছনে পেছনে বুলাও ঢুকে পরে রান্না ঘরে! মায়ের সাথে সকালের নাস্তা তৈরীতে হাত লাগায়।

আসমা:
আমার দোহাই দিসনা চৈতী, নিজের চরকায় তেল লাগা, থুক্কু তেল তোর চরকায় যথেষ্ট আছে, একটু সিমেন্ট, বালি মিশাইয়া লাগা, তেলের কার্যকরিতা কিছু কমলে কমতেও পারে!

শিলা শেখ:
বুলা দেখতো গাছি রমিজ উদ্দি রস নিয়া আসছে কিনা!

বুলা উঠে বাইরে উঠোনে যেতেই দেখে রমিজ কাকা রস নিয়ে ঢুকলো মাত্র!

বুলা:
কাকা একেবারে সময়মত আসছেন। আপনার রস দিয়া জাউ খাইতে চৈতী বইসা আছে রান্না ঘরে!

রমিজ:
আইজ একটু দেরী হইয়া গেলো মা আমার। যে কুয়াশা নামছে আসমান থেইক্যা কিছু দেখা যায়না ভালো কইরা।

রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে আসে চৈতী, সাথে আসমাও এগিয়ে আসে রমিজের দিকে।

আসমা:
চাচা, এই ভুতনীর জন্য এক হাঁড়ি বেশী দিয়া যান।

রমিজ:
তালুকদার বাড়িতে কি রসের অভাব।(হাসতে হাসতে বলে রমিজ)।

চৈতী:
কাকা, তালুকদার বাড়ির রসে তোমার হাতের মিষ্টি কি আছে? নাই, তাই সাত সকালে এই বাড়িতে হাজির। দেন এক কলস বেশি থাকলে দেন।

রমিজ এক হাঁড়ি রস বেশি দিয়ে ফিরে যায় তার পরবর্তি গন্তব্যে। সারা সকাল আজ বুলাদের বাড়িতে ছোটখাট উৎসব বইয়ে দিলো চৈতী।

স্বপ্ন দর্পণ

চৌদ্দ

তুলসী, বুলবুল, সুকুমার ও বাবু একসাথে এসে হাজির বুলাদের বাড়িতে ঠিক রসের জাউ যখন চুলা থেকে নামিয়েছন শিলা শেখ।

সুকুমার:
বুলা, এই বুলা, একটু বাইরে আসবি?

সুকুমারের কন্ঠ শুনে বুলা আসমা একে অন্যের দিকে তাকায়!

আসমা:
কিরে ভুতনি তুই এই চাইর বান্দররেও খবর দিয়া আইলি নাকি অশরীরী আত্মা হইয়া?

চৈতী মুচকি মুচকি হাসছে। বুলা রান্নাঘর থেকে বের হয়ে চার বন্ধুকে উঠোনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে দালানের দরজা খুলতে যায়।

বুলবুল:
শোন আমরা বসমুনা, চল চৈতীদের বাড়ি। আইজকা যে ঠান্ডা পরছে ঐ পাগলী নিশ্চয়ই এখোনো ঘুমে ন্যতান্যাটা। ওরে আইজকা ঘুম থিকা উঠামুই উঠামু। খালি আমাগোরে সে প্যারা দেয় আইজকা আমরা ওরে প্যারার শেষ দেখাইয়া ছাড়ুম। অসমারে সাথে নিয়া যাইতে হইবো

বাবু:
খামাখা মাইয়্যাডার মেজাজ গরম করবি আইজকা। শেষে নৌকা পিকনিক না আবার ভণ্ডুল হইয়া যায়!

সুকুমার:
আরেনা, কিছু হইবোনা। বরং খুশিই হইবো দেখিস!

তুলসী:
আমারও তাই মনে হয়। চল দেরী করলে দেখা গেলো সে আমাগোরে দরজা খুইলা নিজেই ঘরে আমন্ত্রন জানাইলো!

বুলবুল:
আরে তুলসী দাস দেখি সাহিত্যের ভাষার শব্দ ব্যবহার করতে শুরু করলো। কিরে, চিঠিপথ লিখার মানুষ পাইলিনাকি?

কুয়াশা এখনো সেই একই জায়গায় অবস্থান করছে। চৈতী রান্না ঘরের ভেতর থেকে সব শুনে জানালা দিয়ে বের হয়ে সদর দরজা খুলে চার বন্ধুর পেছনে দাঁড়িয়ে। বুলা দেখেও চুপ করে আছে। মজা যেহেতু আজ শুরু হয়েছে, চলুক মজা। চৈতী তার চুলগুলো ছড়িয়ে মুখের সামনে এনে ঠিক বাবুর পেছনে দাঁড়িয়ে। গায়ের শাল এলোমেলো করে গায়ে জড়ানো। এই গ্রুপে ছেলেদের মধ্যে বাবু শুধু শান্তশিষ্ট নয়, একটু ভীতও বটে! হঠাৎ চৈতী নাকে এক অস্বাভাবিক ধরনের শব্দ এনে খুব জোরে জোরে নিঃশ্বাস ছাড়তে থাকে। ভারী নিঃশ্বাস ও সেই অস্বাভাবিক শব্দের সংমিশ্রনে এমন অদ্ভুত গোঙানির আওয়াজ হচ্ছিলো যে বাবু বিকট চিৎকার দিয়ে সোজা বুলাদের ঘরে ঢুকে পরলো। বাবুর হঠাৎ চিৎকারে বাকী তিনজনের মধ্যে বুলবুল রান্নাঘরে, তুলসী বুলার ঠিক পেছনে, শুধু সুকুমার সোজা নিজের অবস্থানেই দাঁড়িয়ে থেকে পেছনে ঘাড় ঘুড়িয়ে চৈতীর এলোমেলো লম্বা চুল ধরে দিলো এক টান।

চৈতী:
উফ!! ছাড় কইতাছি, আমি চৈতী।

সুকুমার চৈতীর চুল ছেড়ে দিতেই লাথি কিলের ঝরের মুখে পরে সুকুমার। দৌড়ে সেও চলে যায় রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা বুলার মার কাছে। চৈতী সুকুমারের পেছনে গেলেও কিছু করতে পারলোনা। বুলার মা চৈতীকে বুকে জড়িয়ে ধরে আদর করতে লাগলো!

শিলা শেখ:
পাগলী হইছে, দেখ তোর ভয়ে আমার কাছে আইসা লুকাইছে, এখন তুই কিছু করলে আমার সম্মান কি থাকবো?

চৈতী নিমেষে ঠান্ডা হয়ে যায়। ছোট্ট বালিকার মত বুলার মাকে সে কষে জড়িয়ে ধরে। পৃথিবীর সমস্ত ভালবাসা এই দুইজনের উপর ভর করলে ছুটে আসে বুলা! আসমা শিলা শেখের চোখের জল মুছে দেয়, কাঁদে আত্মার আত্মীয়দের সুখের পরশে। বুলবুল, তুলসী বাবু রান্না ঘরে ঢুকবার মুখে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকে। সুকুমার চেয়ে থাকে সেই রমনীদের পানে, যাদের সাথে রক্তের মিল নেই, আছে আত্মার গভীর মিল!

চলবে…….

ফজলুল বারী বাবু,
ফেব্রুয়ারি ২০২২ ইং,
লন্ডন, যুক্তরাজ্য।

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Close