কমিউনিটি
প্রতারণার দায়ে দোষী সাব্যস্ত এক্সেলসিয়র সিলেটের সাইদ চৌধুরী

আব্দুল বারীর অর্থ ফেরত না দেয়া পর্যন্ত সম্পত্তির উপর ইনজাঙ্কশন
নতুনদিন ডেস্ক: প্রতারণার দায়ে দোষী সাব্যস্ত এক্সেলসিয়র সিলেটের সাইদ চৌধুরী। বিনিয়োগের অর্থ ফেরত পেতে কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব আব্দুল বারীর করা মামলায় প্রতারণার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন সাইদ চৌধুরী। আব্দুল বারীর পাওনা অর্থ ফেরত না দেয়া পর্যন্ত সাইদ চৌধুরী এবং তাঁর স্ত্রী আফিয়া খাতুন চৌধুরীর সম্পত্তির ওপর ইনজাঙ্কশন জারি করেছে আদালত।
গত বছরের ২৭ অক্টোবর সেন্ট্রাল লন্ডনের কাউন্টি কোর্টের বিচারক সন্ডার্স আলোচিত মামলার রায় ঘোষণা করেন। আর ইনজাঙ্কশনের রায়টি আসে গত ৩ ফেব্রুয়ারি। গত ৮ ফেব্রুয়ারি ভার্চয়াল সংবাদ সম্মেলনে আব্দুল বারী এই মামলা এবং রায়ের বিস্তারিত তুলে ধরেন।
বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রকল্পে যুক্তরাজ্য প্রবাসীরা বিনিয়োগের পর প্রতারিত হওয়ার অভিযোগ তুলেন। এ রায় সেসব ভুক্তভোগী এবং প্রতারকদের জন্য ন্যায়বিচারের বড় নিদর্শন হিসেবে হয়ে থাকবে।
মামলার পক্ষগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নে বিচারক বলেন, “জনাব বারীকে আমার অত্যন্ত স্পষ্টবাদী এবং অল্প কথায় জবাব দেয়া লোক মনে হয়েছে-তিনি সবগুলো প্রশ্নের সরাসরি জবাব দিয়েছেন। তাঁর পক্ষের সাক্ষীরাও ছিলেন বিশ্বাসযোগ্য।”
আর সাইদ চৌধুরী সম্পর্কে বিচারক বলেন, “সাইদ চৌধুরীকে বেশভ‚ষায় একজন অমায়িক মানুষ বলে মনে হলেও তিনি মোটেও বিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তি নন। শুনানীর বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি দাবি করেছেন, তাঁর কাছে সবকিছুর প্রমাণ আছে। বাস্তবে তিনি কোনো গ্রহণযোগ্য প্রমাণ হাজির করেননি।”
সাইদ চৌধুরী সম্পর্কে বিচারক আরও বলেন, তার জাবাবগুলো ছিলো দীর্ঘ, প্যাঁচালো এবং গোঁজামিলপূর্ণ। তিনি প্রায়ই প্রশ্নের জবাব দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। এতে অনুধাবন হয়েছে যে তিনি আমার কাছে পুরো সত্য প্রকাশ করছেন না।
আব্দুল বারী এক্সেলসিয়র সিলেট প্রকল্পে ৫৩ লাখ বিনিয়োগ করেছিলেন। সাইদ চৌধুরীর প্রতারণার বিষয় টের পেয়ে আরও কয়েকজন বিনিয়োগকারী সহ আব্দুল বারী সাথে সাথেই তাঁর অর্থ ফেরত চান। কিন্তু সাইদ চৌধুরী বার বার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে ৮ বছরেও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেননি। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে আব্দুল বারী ব্রিটিশ আদালতে মামলা করেন।
এ মামলার অন্যতম লক্ষণীয় দিক হলো- আব্দুল বারী এক্সেলসিয়র সিলেট প্রকল্পে বিনিয়োগ করলেও আদালত সাইদ চৌধুরীকে ব্যক্তিগতভাবে দোষী সাব্যস্ত করেছে। বিচারক বলেন, “এটা প্রতিষ্ঠিত আইন যে, যখন কোনো কোম্পানির পরিচালক অসততার আশ্রয় নেন তখন তার দায় ব্যক্তিগতভাবে ওই পরিচালকের ওপর বর্তায়। উদাহরণ হিসেবে তিনি একটি মামলার নজির তুলে ধরেন।”
আব্দুল বারীর বিনিয়োগের ৫৩ লাখ টাকা, মামলার খরচ এবং ইন্টারেস্ট সহ ১৪ দিনের মধ্যে ফিরিয়ে দিতে সাইদ চৌধুরীর প্রতি নির্দেশ দেয় আদালত। টাকা ফেরত না দেয়ায় আব্দুল বারী ভিন্ন এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সাইদ চৌধুরী এবং তাঁর স্ত্রী আফিয়া খাতুন চৌধুরীর সম্পত্তির ওপর ইনজাঙ্কশন জারি করেছে আদালত। এ ইনজাঙ্কশন সাইদ চৌধুরীর বাংলাদেশের পৈত্রিক, ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক সম্পত্তির ওপরও কার্যকর।
লিখিত বক্তব্যে আব্দুল বারী বলেন, “আমাদের কমিউনিটিতে বাংলাদেশে বিনিয়োগের নামে প্রতারণার শিকার হওয়ার ঘটনাগুলো বেশ আলোচিত। প্রতারিত হওয়া ব্যক্তিরা ব্রিটেনের আদালতে বিচার চাইতে গেলে উল্টা বিপদে পড়বেন বলেও ভয় দেখায় এই প্রতারক চক্র। আমার এই মামলায়ও প্রতারক সাইদ চৌধুরী নিজের মিথ্যাচার ও প্রতারণা আড়াল করতে আমার বিনিয়োগের অর্থের সোর্স কি এবং আমি যে বাংলাদেশে অর্থ পাঠিয়েছি সেগুলো মানি লন্ডারিংয়ের পর্যায়ে পড়ে কিনা- তা বিবেচনার জন্য বিচারকের প্রতি অনুরোধ জানান। অথচ সাইদ চৌধুরী নিজেই আমাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন ভেঙ্গে ভেঙ্গে বিভিন্ন জনের নামে টাকাগুলো পাঠাতে, যাতে তার একাউন্টে জমা হতে কোনো অসুবিধা না হয়। এটাও ছিলো তার প্রতারণার পরিকল্পনার অংশ।”
মামলার পেছনের ঘটনা বর্ননা করে আব্দুল বারী বলেন, সাইদ চৌধুরী সাংবাদিক পরিচয়ে কমিউনিটির বিভিন্ন গণ্যমাণ্য ব্যক্তিদের সান্নিধ্যে আসেন এবং প্রিন্স চার্লসের মত ব্যক্তির সাথে নিজের ছবি দেখিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করে বিনিয়োগের নামে প্রতারণার ফাঁদ পাতেন। লন্ডন মুসলিম সেন্টারের মত একটি গুরুত্বপূর্ণ আস্থার জায়গায় তাঁর অফিস ছিল। আমিও অনেকের মত তার মিষ্টি কথায় ভুল করে তার প্রচারণার ফাঁদে পা ফেলি। কিন্তু বিনিয়োগের সপ্তাহখানেকের মাথায় অনুষ্ঠিত প্রথম বোর্ড মিটিংয়ে গিয়ে হতাশ হই। প্রজেক্টে মোট বিনিয়োগকারী কতজন? মোট কত টাকা বিনিয়োগ সংগ্রহ করা হয়েছে কিংবা কোম্পানির আগের বোর্ড মিটিংয়ের মিনিটস কোথায়-এমন সব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের কোনো ডকুমেন্টারি জবাব দিতে পারেননি সাইদ চৌধুরী। যে কারণে ওই মিটিংয়ের পরপরই বিনিয়োগ ফেরত দিতে বলি। বছরের পর বছর নানা চেষ্টা, তদবিরের পরও টাকা ফেরত না পেয়ে আব্দুল বারী ২০১৮ সালের প্রথম দিকে সাইদ চৌধুরী এবং এক্সেলসিয়র সিলেটকে বিবাদী করে মিথ্যাচার ও প্রতারণার সাতটি অভিযোগ এনে ব্রিটিশ হাইকোর্টে মামলা করেন। পরে সেটি সেন্ট্রাল লন্ডনের কাউন্টি কোর্টের বিজনেস অ্যান্ড প্রোপার্টি সেকশনে স্থানান্তরিত হয়। বিচারক ছিলেন এইচএইচ জে স্যান্ডার্স। দীর্ঘ প্রায় আড়াই বছর নানা ডকুমেন্ট, সাক্ষ্য-প্রমাণ আদান- প্রদানের পর ২০২০ সালের ২৭ জুলাই থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত পাঁচদিন এ মামলার শুনানী অনুষ্ঠিত হয়।
এ মামলায় সাইদ চৌধুরী এবং এক্সেলসিয়র সিলেট লিমিটেডের বিরুদ্ধে প্রতারণা ও মিথ্যাচারের মোট অভিযোগ ছিলো সাতটি। এরমধ্যে চারটি প্রমাণিত হওয়ার পর বাকীগুলো প্রমাণের প্রয়োজনবোধ করেননি বিচারক। বিচারক তাঁর রায়ের পক্ষে সাইদ চৌধুরীর মিথ্যাচারের কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরেন। বিচারক বলেন, “চৌধুরী (সাইদ চৌধুরী) আমাকে বার বার বলেছেন, তিনি এ মামলার সঙ্গে সম্পৃক্ত সকল প্রমাণ-পত্র হাজির করেছেন। বাস্তবে এ কথা মোটেও সত্য নয়।”
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, প্রতারণার বিষয়ে কথা বলার কারণে সাইদ চৌধুরী চক্র আব্দুল বারী সহ বেশকয়েকজনের যুক্তরাজ্য প্রবাসী বিনিয়োগকারীর নামে বাংলাদেশে মিথ্যা মামলা দিয়েছে। ওই মামলায় তাদের বিরুদ্ধে ওয়ারেন্টও হয়ে আছে। ব্রিটিশ আদলতের রায় বাংলাদেশের আদালতের জন্য দিক নির্দেশক হয়ে থাকবে।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, “সাইদ চৌধুরী চক্র বিনিয়োগের নামে সাধারণ প্রবাসীদের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। ব্রিটেনের আদালতে সাইদ চৌধুরী প্রতারক হিসেবে প্রমাণিত হওয়ার পরও যারা তাকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেবেন তাঁরাও সাইদ চৌধুরীর অপকর্মের দায় কোনোভাবে এড়াতে পারবেন না।”
সাইদ চৌধুরী ইদানিং বিভিন্ন গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে বড় বড় লেখা লিখে নিজের ফেইসবুক, ওয়াটঅ্যাপ সহ নানাভাবে প্রচার করছে উল্লেখ করে আব্দুল বারী বলেন, “আমার আশঙ্কা হয়, এই প্রতারক নতুন কোনো ফন্দি মাথায় নিয়ে গণ্যমান্য ব্যক্তিদের বিভ্রান্ত করছে কি-না?” আদালতে প্রতারক হিসেবে চিহ্নিত সাইদ চৌধুরী সম্পর্কে সকলকে সতর্ক থাকার আহবান জানান আব্দুল বারী।
সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন আব্দুল বারী।
প্রমাণিত অভিযোগগুলো হলো :
* বিনিয়োগ চাওয়ার সময় সাইদ চৌধুরী এক্সেলসিয়র সিলেট লিমিটেডে ৪১ জন ডাইরেক্টর এবং ৩০ জন শেয়ার হোলডার আছে বলে দাবি করেছিলেন। মোট ৪৯ জন পূর্ণ হয়ে গেলে ডাইরেক্টর হওয়ার সুযোগ আর থাকবে না বলে দাবি করেছিলেন। কিন্তু আদালতে সাইদ চৌধুরী এমন দাবির কথা অস্বীকার করেন। তবে জনাব বারীর উত্থাপিত প্রমাণপত্র থেকে স্পস্ট হয় যে, সাইদ চৌধুরী ওইসব কথা বলেছিলেন।
বিচারক বলেন, বাস্তবে কোম্পানি ইনকরপোরেশনের সময় ডাইরেক্টর ছিলেন মাত্র তিন জন। ২০১৫ সালের ৩০ জুন আরও তিনজনকে ডাইরেক্টর নিয়োগ দেয়া হয়। এমনকি ২০১৮ সালের ১১ জুন এ প্রতিষ্ঠানের ডাইরেক্টর সংখ্যা হয় ২১ জন। যা সাইদ চৌধুরীর দাবি করা সংখ্যা থেকে অনেক কম।
বিচারক বলেন, আমি সন্তুষ্ট যে বাদী যদি ডাইরেক্টর সংখ্যা এবং প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃত অবস্থা জানলে এ প্রজেক্টে বিনিয়োগ করতেন না* প্রমাণিত হয়েছে যে ২০১৪ সালের মে মাসের মধ্যে জনাব বারী থেকে বিনিয়োগের সকল অর্থ আদায় করে নেয়া হলেও অন্যান্য অংশীদারদের টাকা পরিশোধের জন্য বাড়তি সময় দেয়া হয়েছে।
* কোম্পানির কোনো দেনা নাই বলে দাবি করা হয়েছিলো- বাস্তবে সেটি ছিলো চরম মিথ্যাচার।
* সাইদ চৌধুরী দাবি করেছেন, আব্দুল বারী ৫৩ লাখ নয়; ৪০ লাখ টাকা দিয়েছেন। নিজে এবং তাঁর আত“ীয় স্বজনের মাধ্যমে বাংলাদেশে অর্থ পাঠিয়েছেন। যা মানি লন্ডারিংয়ের পর্যায়ে পড়ে কিনা সেটিও বিবেচনার জন্য বিচারকের প্রতি অনুরোধ জানান। কিন্তু বিচারক বলেন, জনাব বারী যে ৫৩ লাখ টাকা দিয়েছেন তা ব্যাংক স্টেইটমেন্ট দ্বারা প্রমাণিত।
অর্থ পাঠানোর সুবিধার জন্য পরিবারের নিকটজনদের কাছ থেকে সাহায্য নেয়াতে আমি অন্যায় কিছু দেখছি না। তিনি মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ সরাসরি খারিচ করে দেন।



