কমিউনিটি
২২টি ক্লাসে ৩০০ শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করল ইয়াং কমিউনিটি ল্যাঙ্গুয়েজেস সার্ভিস
টাওয়ার হ্যামলেটসে জমকালো আয়োজনে উদ্বোধন করলেন নির্বাহী মেয়র লুৎফুর রহমান

টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের উদ্যোগে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করল ইয়াং কমিউনিটি ল্যাঙ্গুয়েজেস (ওয়াইসিএল) সার্ভিস। শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি বিকেল ৫টা থেকে ৭টা পর্যন্ত টাউন হলের গ্রোসার’স উইংয়ে আয়োজিত জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন টাওয়ার হ্যামলেটসের এক্সিকিউটিভ মেয়র লুৎফুর রহমান।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ডেপুটি মেয়র ও এডুকেশন, ইয়ুথ অ্যান্ড লাইফলং লার্নিং বিষয়ক কেবিনেট মেম্বার কাউন্সিলার মাইয়ুম তালুকদার, বিভিন্ন কমিউনিটির অভিভাবক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও বিশিষ্ট অতিথিবৃন্দ।
অনুষ্ঠানের শুরুতে অতিথিদের নিবন্ধন, চা-কফি ও নেটওয়ার্কিংয়ের মধ্য দিয়ে এক আন্তরিক পরিবেশ তৈরি হয়। এরপর ওয়াইসিএল সার্ভিসের পরিচালকের স্বাগত বক্তব্যের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। অনুষ্ঠানে সুপরিচিত শিক্ষাবিদ ড. বেকি উইনস্ট্যানলি ‘ঐতিহ্যবাহী ভাষার গুরুত্ব’ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন।

পাঁচ মিনিটের একটি বিশেষ ডকুমেন্টারি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওয়াইসিএল সার্ভিসের লক্ষ্য, কার্যক্রম এবং শিক্ষার্থীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়।
অভিভাবক তাহমিনা খানম তার বক্তব্যে বলেন, ছোটবেলায় বাংলাদেশে গিয়ে তিনি বাংলা ভাষা শিখলেও টাওয়ার হ্যামলেটসে বসবাসরত অবস্থায় নিজের সন্তানদের সে সুযোগ দিতে পারছিলেন না। ওয়াইসিএল সার্ভিস চালু হওয়ার পর তার সন্তানরা ঘরে ঘরে বাংলা শব্দ বলতে পারছে—যা তার জন্য অত্যন্ত আনন্দের।
এরপর ভাষা শিক্ষার অনুপ্রেরণামূলক অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন কাউন্সিলের ডিরেক্টর গুলাম হুসেইন।

আনুষ্ঠানিকভাবে ওয়াইসিএল সার্ভিসের উদ্বোধন ঘোষণা করেন এক্সিকিউটিভ মেয়র লুৎফুর রহমান। তিনি বলেন,
“টাওয়ার হ্যামলেটস একটি বহুভাষিক ও বহুসাংস্কৃতিক বরো। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা একাধিক ভাষায় দক্ষ, তারা শিক্ষায় ভালো করে, আত্মবিশ্বাসী হয় এবং জীবনে বেশি সফল হয়। সে কারণেই আমরা প্রায় এক মিলিয়ন পাউন্ড বিনিয়োগ করেছি, যাতে আমাদের শিশুরা ইংরেজির পাশাপাশি নিজেদের কমিউনিটির ভাষাও শিখতে পারে।”
তিনি অভিভাবকদের উদ্দেশে আরও বলেন,
“আপনার সন্তানের ভাষাগত দক্ষতা যত বাড়বে, তার চিন্তাশক্তি, সৃজনশীলতা ও ভবিষ্যতের প্রস্তুতিও তত মজবুত হবে।”
ডেপুটি মেয়র মাইয়ুম তালুকদার তার বক্তব্যে বলেন, বহু বছর আগে বাজেট সংকোচনের কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া কমিউনিটি ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাস পুনরায় চালু হওয়ায় শিশু ও তরুণদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ দেখা যাচ্ছে। তিনি বলেন,
“আমি নিজে জর্জ গ্রিনস স্কুলে বাংলা পড়েছি এবং ভালো ফল করেছি। তাই জানি কমিউনিটি ভাষা মানুষের শিকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করে এবং সমাজকে একত্রিত করে।”
ডেপুটি মেয়রের বক্তব্যের পর বিবিসির ‘বেনেফিট অব বাইলিঙ্গুয়ালিজম’ শীর্ষক একটি ডকুমেন্টারি প্রদর্শিত হয়, যেখানে বহুভাষিক দক্ষতার উপকারিতা তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানের শেষ অংশে শিশু-কিশোরদের মনোমুগ্ধকর পরিবেশনা উপস্থিত অতিথিদের মুগ্ধ করে। আরবি ও বাংলা ছড়া-গান, বাংলা কবিতা আবৃত্তি, সোমালি গান এবং চাইনিজ লায়ন ডান্সে টাউন হল প্রাঙ্গণ উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। বিভিন্ন ভাষাভাষী শিশুদের সম্মিলিত পরিবেশনায় বহুসংস্কৃতির অনন্য চিত্র ফুটে ওঠে।

চাইনিজ ভাষার শিক্ষক জিয়াংকান ইয়াং বলেন,
“যখন শিশুরা চাইনিজ ভাষায় শুভেচ্ছা জানিয়ে ক্লাসে ঢোকে, তখন তা সত্যিই আনন্দের অনুভূতি তৈরি করে।”
ছয় বছর বয়সী শিক্ষার্থী মাইমুনা জানায়, সে এখন অ, আ পড়তে পারে—এটা তার কাছে খুবই রোমাঞ্চকর।
উল্লেখ্য, ওয়াইসিএল সার্ভিসের আওতায় বর্তমানে বরোর আটটি কেন্দ্রে বাংলা, আরবি, ক্যান্টনিজ, ম্যান্ডারিন ও সোমালি—এই পাঁচটি ভাষায় সপ্তাহে মোট ২২টি ক্লাস পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী অংশ নিচ্ছে। স্কুল সময়ের বাইরে ও সপ্তাহান্তে পরিচালিত এসব ক্লাস শিশুদের ভাষাশিক্ষার পাশাপাশি তাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীর সংযোগ তৈরি করছে।
ভবিষ্যতে আরও বেশি স্কুল ও কমিউনিটি সেন্টারে এই কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২৬ সালের মে মাস থেকে বাংলা ও অন্যান্য কমিউনিটি ভাষায় জিসিএসই ও এ-লেভেল কোর্স চালুর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে, যাতে শিক্ষার্থীরা ২০২৭ সালের পরীক্ষায় অংশ নিতে পারে। প্রাইমারি পর্যায় শেষে শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সার্টিফিকেট দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
এই সার্ভিসটি টাওয়ার হ্যামলেটসে বসবাসকারী, এই বরোর স্কুলে অধ্যয়নরত এবং যাদের বাবা-মা বা অভিভাবক টাওয়ার হ্যামলেটসে কর্মরত—সব পরিবারের জন্য উন্মুক্ত। ফলে শিশুরা সহজেই নিজেদের মাতৃভাষা ও কমিউনিটি ভাষার সঙ্গে নতুন করে সংযোগ স্থাপনের সুযোগ পাচ্ছে।



