অন্যান্য
“পসার লাভ সহজ নয়, পসারে সুখের ক্ষয়! তাই বলে পসারে করতে নেই ভয়, শুধু পসার যেনো দুঃখনা বয়”!!!!
মানুষ জন্ম নেয় উদাম দেহে, নগ্নপায়ে, শুন্যহাতে। কিন্তু তার একজন মা থাকেন, থাকে একটি পিতার পরিচয়। পিতার পরিচয় অনেক সময় সন্তানটি তার পিতার কারনে বঞ্চিত হয়, কিন্তু মা জানেন তার সন্তানের আসল পিতৃ পরিচয়। ধনী ঘরে জন্ম নিলেই একটি সন্তানের জীবন বর্ণাঢ্য হবে এমন কোনো কথা নেই। আবার নিঃস্ব বাবা মায়ের সন্তান আজন্ম দারিদ্র্য সীমায় অতিবাহিত করবে এমন কথাও কেউ হলফ করে বলতে পারিনা!
প্রতিটি বাবা মা তার সন্তানের জন্য ভাবেন তার নিজ নিজ জায়গা থেকে! সন্তান মানুষের মত মানুষ হবে, জীবনে অনেক ভালো জায়গায় অবস্থান করবে, ভালো থাকবে, ভালো কাজ দিয়ে পৃথিবীকে জয় করবে। কিন্তু সব বাবা মা কি সফল হয় তাদের ইচ্ছের দৌড়ে! না হয়না! এর অনেকগুলো কারন আছে, আমি কিছু বিষয়ের মধ্য দিয়ে সেই আলোচনায় যেতে চাই! উহু, একটু গল্পছলে যদি আমি এগোই সবার কাছে সহজে বোধগম্য হবে বিষয়গুলো, একই সাথে বাস্তব কিছু গল্পের মুখোমুখি হতে পারবো আমি, আমার মাধ্যমে আমরা!!!
গল্প এক
মোজাম্মেল হোসেন দেশের একটি বড় কোম্পানীর বড় কর্তা! এই বড় কর্তা হয়ে উঠতে তাকে অনেক ত্যাগ তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে এগিয়ে আসতে হয়েছে! মোজাম্মেল হোসেনের বাবা ছিলেন একজন সফল কৃষক! সাত সন্তানের বড় সন্তান মোজাম্মেল বাবার কৃষি কর্মের পরিবর্তে পড়াশোনায় আগ্রহী ছিলো। তার বয়স যখন পাঁচ, বাড়ীর কাচারী ঘরে ইদ্রিস মাস্টারের কাছে অক্ষরজ্ঞান নিয়ে ছয় বছরেই মাস্টার সাহেবের জোরাজুরিতে নিকটস্থ পাঠশালায় ভর্তি হয়! মেধার দুরন্তপনায় মোজাম্মেল পাঠশালার পরিসমাপ্তির পর যখন উচ্চ বিদ্যালয়ে ডাক পেলো বাবা রইস উদ্দিন বেঁকে বসলেন। কি কারনে এতো বিদ্যা অর্জন করতে হবে ছেলেকে! হিসাব নিকাশ সে ভালোই বুঝতে শিখেছে পাঠশালায় পাস দিয়ে। জমিজমার কাজে এই হিসাব নিকাশই প্রয়োজনের তুলনায় অনেকবেশী! তাছাড়া সাত আট মাইল দূরে গঞ্জে নিত্যদিন উচ্চ বিদ্যালয়ে কি করে যাবে সে। উপর্যপুরি অর্ধেক পথ পায়েহাটা, অর্ধেক জলপথ! বিশাল প্যারা নিয়ে বিদ্যালাভের পরিবর্তে যে জমিজিরাত আছে রইস উদ্দিনের সেগুলোর চাষবাস কামলা দিয়ে ঠিকমত করাতে পারলে বছরান্তে দুইচার দশ বিঘা জমি কেনা কোনো ব্যাপারই না!
“একটু আলোচনায় আসি। রইস উদ্দিনের বাপদাদার থেকে পাওয়া সম্পদ এবং নিজস্ব অর্জনের যে পরিমান জমিজমা সেই মুহূর্তে তার প্রাপ্তিতে, সেই সম্পদ ও জমিজমা সাত ছেলেমেয়ের মধ্যে সঠিকভাবে বন্টন করে দিয়েও নিজের জন্য মৃত্যু অবধি কিছু করবার দরকার রইস উদ্দিনের ছিলোনা সেই ধারনা তার খুবই স্পষ্ট। তবুও সম্পদ ও জমিজমার পসারে তার লোভ কিংবা বৈষয়িক উন্মাদনা নিজ সন্তানকে শিক্ষা দান করা থেকে বিমুখ করে তুলেছে! একইসাথে তার চাইতে অপেক্ষাকৃত দরিদ্র কৃষকদের ক্ষেতজিরাত তাদের দৈন্যতার সুযোগে স্বল্পদামে কিনে কিনে সেই সকল কৃষকদের নিঃস্ব করে নিজে হচ্ছে সর্বেসর্বা!
দুটি বিষয় গল্পের এই অবধি আমাদের কাছে সুস্পষ্ট।
১/ সম্পদ পসারে একজন রইস উদ্দিন ইচ্ছে করেই ভুলে গেছে শিক্ষার আলোয় কতটা সুফল আছে। গঞ্জে যাতায়াত, তারউপর জমিজমা ক্রয়ের নিমিত্তে যতটুকু খবরাখবর সে এদিক সেদিক থেকে অর্জন করে, তাতে তারমত বুদ্ধিমান চতুর মানুষ খুব ভালোই উপলব্ধি করতে পারে শিক্ষা অর্জনের ব্যাপকতা। তাইতো অতি শিক্ষা লাভের পর সন্তান যেনো হাতছাড়া হয়ে না যায় সেই বিষয়টাকে মাথায় গুলিয়ে ঢুকিয়ে নিয়েই মোজাম্মেল হোসেনের উচ্চ বিদ্যালয়ে গমনের ব্যাপারটি একেবারে খারিজই করে দিয়েছে!
২/ রইস উদ্দিনের সম্পদ ও জমিজিরাত পসারের কারনে আশেপাশের গরীব আত্মীয় স্বজন থেকে শুরু করে দূর দুরান্তের গরীব চাষীদের তার লোভের শিকার হয়ে হতে হচ্ছে আরোবেশী গরীব! অথচ দূর দুরান্তের চাষীদের বাইরেই নিকট আত্মীয় স্বজনদের প্রতি সে যদি সহনশীল হোতো তবে সেই অপেক্ষাকৃত দরিদ্র আত্মীয় স্বজন হোতোনা নিঃস্ব, বরং সবাই মিলে একসাথে পাশাপাশি থাকায় যে একতার দৃষ্টান্ত তৈরী হতো তার কারনে আজীবন মানুষের ভালবাসায় রইস উদ্দিন হয়ে উঠতো সবার নয়নের মনি”!
বিনামণি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোতালেব সিকদার রইস উদ্দিনের খুব কাছের মানুষ! যে পাঠশালা থেকে মোজাম্মেল হোসেন পাস করেছে অতন্ত্য মেধার সাথে, সেই একই পাঠশালায় এক সময় প্রধান শিক্ষক মোতালেব সিকদার এবং রইস উদ্দিন প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করে! অবশেষে এই একই পন্থায় রইস উদ্দিনের বাবা হযরত আলী ছেলেকে টেনে নিয়েছে চাষবাসের জন্য। অন্যদিকে মোতালেব সিকদার পায়ে হেটে, নৌকায় চড়ে এই গঞ্জেরই বিনামণি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেট শেষ করে জেলা শহরে লজিং মাষ্টারী এবং কলেজের পাঠ চুকিয়ে ঢাকায় এসে শিক্ষককতার শিক্ষায় মনোনিবেশ করে। আজ তার কত ছাত্রছাত্রী! কত সম্মান তার, দেশ বিদেশ থেকে দেখে যায় প্রিয় শিক্ষককে এক নজর। এর চাইতে বড় পাওয়া কি অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে জমির তাবেদার হওয়ায় কি আছে!
ফজলুল বারী বাবু,
১১ নভেম্বর ২০২১ ইং,
সকাল, লন্ডন।
চলবে………



