বিনোদন

স্বপ্ন দর্পণ

 

প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্বের লিংক

স্বপ্ন দর্পণ

 

চার

মানুষের প্রকৃতি, আকৃতি, স্বভাব, মানসিকতা সবকিছুতেই পরিবর্তন আসে বয়সের সাথে সাথে। তবে একজন মানুষ তার বাল্যকাল থেকে কৈশোর, তারপর যৌবনের প্রথম ধাপের স্মৃতিকথা, সেই সময়ের অনেক ভালোলাগা, মন্দলাগা কিছুতেই ভুলতে পারেনা যদিনা তার ভুলবার রোগ তাকে জব্দ করে ফেলে। ঠিক একইভাবে এলাকার শান্ত পড়ুয়া ছেলেটি কখনো কখনো হয়ে যায় দাপটে মাস্তান। দুরন্ত মেয়েটি হয়ে যায় শান্ত ও শিষ্টাচারে সবার উদাহরন।

সাপ হাতে পেঁচিয়ে ছুটে বেড়ানো, বানরের লেজ ধরে বানরকে পোষ মানানো দুষ্টের শিরোমণি “শিমুলগঞ্জের” হানাদলের দুই নাম্বার বিচ্ছু সুকুমার দেবনাথ কম্পিউটার সায়েন্স এর শিক্ষক বিলেতের এক নামকরা কলেজে! ছাত্রছাত্রীদের কাছে সে এখন অন্য ভুবনের জিনিয়াস। সুকুমারের আচার ব্যবহার দেখে আশেপাশের কেউ বুঝতেই পারেনা সে বালকিশোর বয়সে ছিলো দুরন্ত সাহসের সেরা। চৈতী নামের এক দুরন্তপনায় শ্রেষ্ঠা বালকিশোরীর সে ছিল ডানহাত।

কলেজ থেকে এক সপ্তাহের ছুটি নিয়েছে সুকুমার। ছেলের স্কুলে এক সপ্তাহের হাফটার্ম। তাই শ্রাবন্তী দেবনাথ মানে সুকুমারের স্ত্রী আগেভাগেই পতিদেবকে এই সময় ছুটি নিয়ে রাখবার আদেশ জারি করে রেখেছিলো। মজার ব্যাপার হলো শ্রাবন্তী ছেলের প্রাইমারী স্কুলে সহযোগী অঙ্কের শিক্ষক হিসেবে এক বছর হলো শিক্ষকতা শুরু করেছে। তাই ছেলে আর মায়ের ছুটি এক, কিন্তু ঘরের কর্তার কলেজের সাথে ছুটির গরমিল। চতুর্থ শ্রেণীর অতুল দেবনাথ স্কুল থেকে মিউজিয়াম, থিয়েটার, আরো নানা জায়গায় গিয়েছে। কিন্তু চিড়িয়াখানায় সে এখনো যায়নি। তাই মায়ের কাছে ছেলের বহু আগের আবদার এই হাফটার্ম এ বাবাকে সাথে নিয়ে চিড়িয়াখানা যাবে।

সোমবার সুকুমারের জন্য খুব প্রসন্নতার দিন। কোনো দুর্ঘটনা, দুঃসময় সুকুমারের জীবনে এই দিনটিতে ঘটেনি কিংবা এর কোনোকিছুর নেতিবাচক শুরুও সোমবারে ঘটেছে বলে তার ডায়েরীতে লিখা নেই। তাই যাকিছুই সুকুমার করে সোমবার দিয়েই শুরু করে। ছুটিতে শ্রাবন্তী ও
অতুলকে জোর করে ঘুম ভাঙ্গায় না। কিন্তু আজ সে ঠিক স্কুলে যাবার যে সময়টাতে মা কাতুকুতু দিয়ে ঘুম থেকে তাকে উঠায়, ঠিক সেই সময়ে উঠে ড্রয়িংরুমে বসে আছে চিড়িয়াখানার ম্যাপ চোখের সামনে মেলে ধরে!

শ্রাবন্তী:
শুভ সকাল। কিরে আজ যে একাই সকালে উঠে বসে আছিস?

অতুল:
( ম্যাপের উপর থেকে চোখ না সরিয়ে) না, মানে চিরিয়খানার ম্যাপেটা দেখে নিচ্ছি!

শ্রাবন্তী:
বাবা, তুই দেখি বড় গেছিস! ম্যাপ দেখতে শিখে ফেললি কবে?

অতুল:
কেনো, এতো আমাদের স্কুল থেকে কোথাও নিয়ে গেলেই প্রথম ম্যাপটা বুঝিয়ে দেয়!

মা ছেলের কথোপকথন এর মাঝেই আড়মোড়া ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে সুকুমার ঢোকে ড্রয়িংরুমে।

সুকুমার:
কিগো, মা আর পুতে কি ষড়যন্ত্র করো? নাস্তা পানি হইবো না আমি কিছু করুম?

শ্রাবন্তী:
তোমাকে না কতবার বলেছি আমাদের সাথে গেয়ো ভাষায় কথা বলবে না!!!

সুকুমার:
বুঝিনাই, কি কইলেন?

শ্রাবন্তী উঠে সুকুমারের পিঠে কিল মারতে শুরু করলো। অতুল দৌড়ে বাবার কোলে গিয়ে উঠলো!

অতুল:
বাবা ডিমের অমলেট করবে প্লিজ? আর সাথে তোমার হাতের পরোটা!

শ্রাবন্তী:
বাঁচা গেলো! যাও এইবার ছেলের জন্য নাশতা বানাও। আমার জন্য একটা ডিমপোজ প্লিজ! একটু গোল মরিচের গুঁড়ো দেবে লক্ষ্মীটি!

অতুল:
জানো বাবা, মা তুমি রান্না করলে ফোনে সবাইকে বলবে,”সুকুমার আজ কিযে সব মজার মজার রান্না করেছে”

সুকুমার;
তাইনাকিরে? তাহলে আজকে তার জন্য কিছু স্পেশাল কিছু করতে হয়, কি বলিস?

সুখের জন্য আসলে অনেক অর্থের প্রয়োজন হয়না। লাগেনা দিনরাত ভুলে স্বপ্নের চূড়ায় পৌঁছাতে অমানুষিক পরিশ্রমের। সুখের জন্য দরকার সাথীর সাথে সাথীর মানসিক মিল, একের প্রতি অন্যের অগাধ বিশ্বাস, কাছের মানুষটির চাওয়ার সাথে নিজের পাওয়ার মেলবন্ধন তৈরী করা, অর্জিত সম্মানীর যথোপযুক্ত ব্যবহার করে একটি হিসেবের ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখা, পাঁচ পেলে তিনের সমন্বয়ে জীবনকে একটি আনন্দময় গন্ডির মধ্যে আটকে সামনের পথে এগিয়ে চলা।

ঠিক এগারোটায় অতুল তার বাবা ও মায়ের সাথে চিড়িয়াখানায় প্রবেশ করলো। তার হাতে ম্যাপটি। খুব সাবধানের সাথে মা আর বাবাকে ম্যাপের নির্দেশনা অনুসারে চিড়িয়াখানার একপাশ থেকে অন্যপাশে নিয়ে চলেছে। সুকুমার অতুলের নির্দেশনায় একটা গরমিল লক্ষ্য করলো। যেদিকে সর্প জাতীয় জীবগুলোর অবস্থান, অতুল সেই দিকগুলো এড়িয়ে যাচ্ছিলো। অতঃপর যেভাবেই হোক অতুল যেখানে অজগর রক্ষিত ঠিক সেইখানে গিয়ে হাজির এবং কিছুটা দুর থেকে অজগরের অবস্থান অবলোকন করতেই Oh My God বলে চিৎকার দিয়ে বাবার কোলে চড়ে বুকে লুকিয়ে রাখলো মুখ।

অতুল:
বাবা, এখান থেকে চলো প্লিজ, এখনই এখন থেকে চলো।

শ্রাবন্তী মাঝে মাঝেই ভিডিও করছিলো অতুলের ঘুরে ঘুরে চিড়িয়াখানা দেখার দৃশ্য। এই মুহূর্তে ঠিক কি মনে করে যেনো শ্রাবন্তী ভিডিও অন করে। ভিডিওতে তোলা হয়ে যায় সর্প দর্শনে অতুলের প্রতিক্রিয়া। সুকুমার ইশারায় শ্রাবন্তীকে ভিডিও অফ করে তাকে অনুসরণ করতে বলে। অতুলের চিৎকারে আশেপাশে সবাই জানতে চাইছিলো তারা ঠিক আছে কিনা, কোনো সাহায্য লাগবে কিনা! সুকুমার অতুলকে বুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বিনয়ের সাথে সবাইকে বলছিলো অনেক ধন্যবাদ সহানুভূতি প্রকাশের জন্য।

একেবারে গেটের বাইরে গিয়ে সুকুমার অতুলকে কোল থেকে নামিয়ে তার মুখ তুলে ধরলো।

সুকুমার:
বাবা এই দেখ আমরা বাইরে চলে এসেছি।

অতুল বাবার কথা শুনে পিটপিট করে তাকালো তার দিকে। শ্রাবন্তী ছেলেকে কাছে টেনে নিলো পরম আদরে। তখনও কাঁপছিল অতুল। সুকুমার একটা রেস্টুরেন্ট খুঁজছিলো। রাস্তার ওপর পারেই ইতালিয়ান পিজ্জা রেস্টুরেন্ট দেখে ছেলের হাত ধরে রাস্তা পার হয়ে তিনজন রেস্টুরেন্টে ঢুকে পছন্দমত একটি টেবিল দেখে বসলো। এরপর সুকুমার প্ৰথমে অতুলকে নিয়ে গেলো ওয়াশরুমে। ফিরে আসতেই দেখে শ্রাবন্তী ছেলের পছন্দের পিজ্জা অর্ডার দিয়ে বাপ ছেলের অপেক্ষা করছে।

শ্রাবন্তী:
অতুলের আজকের ঘটিনাটি ক্যামেরা বন্দী হয়ে যাবে ভাবিনি।

শ্রাবন্তীর চোখ থেকে অশ্রুর ধারা নেমে আসতে লাগলো। চোখের সামনে মোবাইল ফোন। শব্দে সুকুমারের বুঝতে কষ্ট হোলোনা শ্রাবন্তীর ফোনে ভিডিওর কিছু অংশ রেকর্ড হয়ে গ্যাছে। নিজেদের ঘরের পরিবেশ হালকা করতে সুকুমার আর অতুলের জুড়ি নেই!

সুকুমার:
আচ্ছা শ্রাবন্তী তুমি বিয়ের দিন একফোঁটাও কাঁদনী, তুমি কি নিষ্ঠুর আর পাষান ছিলে সেই সময়!

অতুল:
কি বলো বাবা! মা এখনো মহা পাষান!! আমাকে প্রতিদিন যেভাবে সকালে ঘুম থেকে টেনে তোলে তুমিতো দেখোনা।

শ্রাবন্তী:
হয়েছে, আমাকে হাসাবার চেষ্টা করতে হবে না। এই দেখো বাপ ছেলে, দারুন একটা নাটকীয়তা তৈরী হয়ে গ্যাছে ভিডিওটিতে অজান্তেই।

শ্রাবন্তী হাতের মুঠোফোনটি সুকুমারের দিকে বাড়িয়ে দেয়। অতুল বাবার গায়ে নিজেকে জড়িয়ে দেখতে থাকে এই কিছুক্ষন আগের ঘটে যাওয়া ঘটনাটি! হাসতে থাকে সুকুমার আর ছেলে বাবার হাসি দেখে তাকে জোরে জড়িয়ে ধরে!

সুকুমার:
ভিডিওটি আমাকে হোয়াটসআপ করো এখুনি!

শ্রাবন্তী স্বামীর ইচ্ছে পূরণ করতে চট জলদি তার মুঠোফোন থেকে ভিডিওটি পাঠিয়ে দেয়। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে সুকুমার আবার সেই ভিডিওটি কাউকে পাঠিয়ে ফোন করে সেই মানুষটিকই বুঝতে কষ্ট হয়না শ্রাবন্তীর

সুকুমার:
হ্যালো চৈতী দেবী তোরে একটা ভিডিও পাঠাইছি দেখ এখনই।

চৈতী:
একটু সময় দে, একটা গাছের জীবন বৃত্তান্ত শুনছি এক দাদীর কাছে! তোর পরামর্শ নিয়া এই গাছ নার্সারী করতে আইসা যে শিক্ষা অৰ্জন করছি, তাতে দুই এক বছরের মধ্যেই পিএইচডি করতে পারবো দেইখ্যা নিস।

চৈতীর এই বিষয়টি খুব মজার। যখন সে হানাদলের কারো সাথে কথা বলে, তখন ওর কথায় সাধু, চলতি, শুদ্ধ, অশুদ্ধ সব প্যাচ লেগে যায়।

সুকুমার:
দেইখ্যা ফোন দিস। একটু হাসুম দুই শয়তান মিল্যা আর দর্শক আমার সামনে দুইজন!

চৈতী:
ওকে শয়তান, আমি বুড়িরে গাছ গছাইয়া বিদায় দিয়া ফোন করতেছি!

শ্রাবন্তী হাসছিলো দুই বাল্যবন্ধুর বালক বালিকা সুলভ কথায়। কি মিষ্টি সম্পর্ক ওদের, হিংসা হয়। সে যদি চৈতী হোতো তবে এই ভালোলাগার মুহূর্ত সে খুব উপভোগ করতো।

অতুল:
বাবা, তুমি আমাকে নিয়ে চৈতী পিসির সাথে হাসবে?

সুকুমার:
ওরে পাগলা না, আজ এক অজানা গল্প শুনবি তোর পিসির কাছে!

শ্রাবন্তী:
এই চলোনা চৈতীর ওখান থেকে ঘুরে আসি। কতদিন ওর দিলখোলা হাসি দেখিনা!

সুকুমার:
ঐ পাগলীর হাসি দেখতে পাউন্ড খরচ করবে?

অতুল:
বাবা, পিসি মনিকে আর একবার পাগল বললে তোমার চুল টেনে ছিঁড়ে ফেলবো!

সবাই একসাথে হেসে উঠে। খাবার নিয়ে আসা যুবতি টেবিলে খাবার রাখতে রাখতে বলেই ফেলে,”ঈশ্বর তোমাদের হাসিকে আরো প্রাণবন্ত করে তুলুক”।

সুকুমার:
তোমার আশীর্বাদ মাথায় তুলে নিলাম। তুমি কি কিছু মনে করবে আমাদের খাবারে একটু ভাগ নিতে?

যুবতি:
অনেক ধন্যবাদ, আমি মাত্রই আমার এইবেলার খাবার খেয়েছি।

অতুল:
একটু কিছু নাও প্লিজ!

যুবতি এবার আর না করতে পারলো না। সাইড ডিশ থেকে একপিস মাশরুম তুলে মুখে পুরে একগাল হাসি ছড়িয়ে চলে গেলো। দিয়ে গেলো একরাশ ভালবাসা। যে ভালবাসার কোনো রং নেই, নেই কোনো স্বার্থের আভরণ তার মিষ্টি দেগে। সত্যিই তাই, একটু আনন্দ পেতে কিংবা কাউকে উপহার দিতে কিছুই দরকার হয়না। শুধু একটু নির্মল আন্তরিকতা ও কিছু ভালবাসার ছোয়াই যথেষ্ট।

স্বপ্ন দর্পণ

পাঁচ

শবেবরাত এলেই ‘হানাদল” একেবারেই সাধু। সুকুমার ও তুলসী এই সময়ে সবার আদরের পাত্র। বাকীদের “খেলে খাবি, না খেলে যাবি” অবস্থা। চৈতীর একটা বিশেষ গুন হলো যেখানে সে বুঝতে পারবে একটু আদর আপ্যায়ন কম হওয়ার সম্ভাবনা সেখান থেকেই সবার চাইতে বেশী আদর আদায় করে তবেই সেই গৃহ ত্যাগ করবে। মাগরিবের আজানের পর পরই হানাদল শিমুলতলা থেকে শবেবরাতের যাত্রা শুরু করলো। পূর্ব পরিকল্পনা অনুসারে শুরুটা এবার চৈতীর দাদা বাড়ি থেকে হবে। মিনিট পাঁচেকের পথ শিমুলতলা থেকে দাদুর বাড়ি।

আসমা:
বুলা খালাম্মা কি এইবার গরুর কলিজা ভুনা করছে?

বুলা:
হ্যা, সাথে খাসির কলিজা ভুনা এই দুই মহামান্য অতিথিদের জন্য।

বুলবুল:
এই তুলসী, তুই আর সুকুমারনা সেইদিন হোটেলে আমার সাথে গরুর মাংসের ঝোল দিয়া পরাটা খাইলি, বাবু তুইতো আছিলি?

তুলসী:
রাম রাম, কি আবোলতাবোল কথা কস? খাসির মাংসের ঝোল, গোমাংস, কি ধর্ম নাশের কথা!

সুকুমার:
বুলবুলি আপনের আইজকা রাইতে নির্ভয়ে বাড়ি ফিরনের ইচ্ছা আছে?

বুলবুল:
ইশ!! কি ধর্মগুরু আমার! শয়তানের লেঙ্গুর, মুখে রামনাম! ঐ কারে ভয় দেখাস, তোর শয়তানী আমি জানি।

চৈতী:
ওই বান্দরের দল, আইজকানা বরাতের রাইত, এমন ঝগড়া শুরু করলি কেন? থাম সবাই। আর আমাগোরে থুইয়া তোরা চাইরজন পরোটা মাংস খাইলি ব্যাপার কি?

বাবু:
না, আমি কিন্তু অগোরে কইছি, হানাদলের সদস্য এই পর্যন্ত কোনো কাজ আলাদা করে নাই, চল চৈতী, আসমা আর বুলারে ডাইকা নেই! বুলবুইল্যা না করছিলো।

চৈতী:
আচ্ছা এর বিচার হইবো কাইলকা।

বুলবুল:
দোস্ত ভুল হইয়া গেছে, মাফ করন যায়না, মাফ???

আসমা:
হ তা’যায়। সামনের শুক্রবার তুই সবাইরে একই খাওন খাওয়াইবি!

বুলবুল:
আমি রাজি, আরো লগে যা খাইতে চাস খাওয়ামু!

চৈতী:
তাইলে শাস্তির বিধান খারিজ, কি সবাই আমার সাথে একমত?

একত্রে হাততালি দিতে দিতে ঢুকলো চৈতীর দাদুর বাড়িতে। উঠোন পেরোতেই সামনে চৈতীর বড়ফুফুর সাথে দেখা। চৈতী সবাইকে পেছনে ফেলে বড়ফুফুকে জড়িয়ে ধরে। রাহেলার চৈতীর
উদ্দেশ্য বুঝতে বাকি রইলনা। সে সুকুমার আর তুলসীকে ইশারা করে দিলো। তুলসী ও সুকুমার বাকী সবাইকে নিয়ে কাচারী ঘরে গিয়ে বসলো। চৈতীর বড়ফুফু চৈতীকে নিয়ে রান্না ঘরে ঢুকতেই চৈতীর দাদী ইশারায় নাতনীকে কাছে ডেকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো!

চৈতী:
আরে এই বুড়ি, কান্দ কেন? তুমি কান্দ যদি তাইলে এইযে আমি চললাম।

দাদী:
যাবিইতো, আমি তোর কে, ঐ এলাহী তালুকদারের বিবিই তোর সব। আমি তোর বাপেরে পেটে ধরিনাই, তোর গায়ে আমার রক্ত নাই, আমার উপর তোর টান থাকবো কেমনে!!!

এবার আর মিথ্যে উম্মা প্রকাশ করতে পারলোনা চৈতী। দুইহাত প্রসারিত করে সে দাদীকে বুকে জড়িয়ে ধরে আদর করতে লাগলো!

চৈতী:
হইছে, আর মায়া কতদিন কানতে হইবোন। যাও কাইলকাই আমি মারে আর স্বপনরে নিয়া চইলা অসুম।

দাদী:
হইছে, আমারে আর মিথ্যা আশ্বাস দিতে হইবোনা। এইবার আসুক তোর বাপে, তারে কমু ঐ বাড়ী গিয়া থাকতে! রাহেলা, ঐ রাহেলা, কই গেলিরে? আমার নাতনী আর তার বন্ধুগোরে চাইলের রুটি আর খাসির রেজালা দে। যা পাগলী, খাইয়া দেখা কইরা যাইস। আর একটা কথা তুমি কিন্তু বড় হইতাছো বেশি আর বাঁদরামি কইরো না! আর দেরি নাই, নাতনী জামাই খুঁজতাছি

চৈতী;
ধুরো বুড়ি, তুমি বিয়া করো! আমি পাইলট হমু দেইখ্যা রাইখো!

দাদীকে মনভরে আদর করে ছুট দিতেই বড়ফুফু হাত ধরে দার করলো।

বড়ফুফু:
ঐ ছুটবুড়ি দাঁড়া। আমার সাথে হাত লাগা। একহাতে সব খাওন নিতে পারুমনা!

চৈতী:
তুমি নিবা কেন? বাড়ির দেখভাল করইন্যারা কই?

বরফুকু:
আরে ওরাতো নিবই। তুই তোর হানাদলের লিডার। তুই অগোরে খাতিরদারি করলেইনা ওরা তোরে মাইন্য করবো।

প্রথম ভুঁড়ি ভোজন করেই সবার বেহাল অবস্থা! আর কোথাও যাওয়া মানেই পেটের যন্ত্রপাতি নষ্ট করে ঘরে চিৎপটাং হয়ে পরে থাকা। তাই সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলো যেখানেই আজ যে খাবার পাবে সব একসাথে করে কালকে সকালে বাজারে গিয়ে সেখানে যত ফকির মিলবে তাদেরকে নিজেরা বসে খাওয়াবে। যেই সিদ্ধান্ত সেই কাজ। এশার নামাজের আগেই সব খাবার নিয়ে বুলবুলের বাসায় গিয়ে রাখতে হবে। বুলবুলের বাসা থেকে বাজার মাত্র দশ মিনিটের পথ।

বেশ অনেক রুটি হালুয়া ও ঝুরা মাংস পেয়ে গেলো অল্প সময়ের মধ্যে। প্রত্যেক বাড়িতেই অনুরোধ করা হলো খাবারগুলো ভালো বাটি কিংবা পরিষ্কার পলিথিন ব্যাগে দিতে ।যারা গোমাংস বা গরুর কলিজা দিতে চাইলো, তাদেরকে অতন্ত্য বিনয়ের সাথে না করা হলো।

পরের দিন পুরো বাজার হানাদলের প্রশংসায় পঞ্চমুখ! সাত দুষ্টর প্রত্যেক বাড়িতে তাদের এই সুন্দর উদ্যোগের বাহবা হানাদলকে এমন কর্মকান্ড করার পরিকল্পনা করতে উৎসাহিত করলো।

স্বপ্ন দর্পণ

ছয়

মানুষ ভাবে এক ঘটে যায় অন্যকিছু। পৃথিবীর এমন কোনো মানুষ নেই যার জীবনে প্রেমের একটু আধটু জোয়ার আসেনি। তবে কিছু মানুষ অবশ্যই পৃথিবীর বুকে আছে যারা অন্তরের প্রেম ভালবাসাকে অন্তরে লালন করেই জীবনের অনেকটা সময় পার করে এসে জীবনের কোন একপ্রান্তে সেই লুকায়িত প্রেমের দহনে দহিত হতে থাকে।

চৈতী রাতুল আর মৃদুলাকে নিয়ে ভিয়েনা বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে আছে ফুলের বহর সাজিয়ে। লন্ডন থেকে সুকুমার শ্রাবন্তী আর রাতুল আসছে একদিনের নোটিশে। আরো আসছে আসাদুল করিম বাবু কানাডা থেকে। বাবুর আসাটা পূর্ব পরিকল্পিত। এখানকার একটি সামাজিক সংগঠন চৈতীকে অনুরোধ করে বৈশাখী পালনের আয়োজনে গানের শিল্পী হিসেবে আমন্ত্রন জানিয়েছে বাবুকে। মনিকাকে আজ একাই সামাল দিতে হবে গাছফুলের নার্সারীটি। পারভেজ ভাই আসছে তার মিউজিক ভ্যান নিয়ে।

পারভেজ ভাই আর মনিকা চৈতীর এই ভিয়েনার জীবনকে কতটা সরল, সুন্দর ও সমৃদ্ধ করেছে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। পাভেলের সাথে যখন সম্পর্কের একবারেই অবনতির শেষ মুহূর্তকাল তখন আইনি সকল প্ৰকার কাজ এই মনিকার কারনেই সহজ হয়েছে। আর পারভেজ ভাই, সেতো কখনোই প্রকাশ করেনি কারো কাছে, আমি তার আপনবোন নই। রাতুল, মৃদুলা কোনদিনই জানবেনা তাদের মামা দুইজন নয়, মামা ওদের তিনজন।

বাবুর মাধ্যমেই পারভেজ ভাইদের সাথে পরিচয়। গান বাউল বাবু যখন নগরমুখী গানে জড়িয়ে পরলো, তখন পারভেজ ভাইদের ব্যান্ড দলের ভোকালিস্ট ছিলো বাবু। বিয়ের পর ভিয়েনাতে চৈতীর সংসারে চৈতীর আব্বা আম্মা ও দুইভাই নাসিম, জামিলের পর বাবুই প্রথম কানাডা থেকে আসে। নিয়তির কাছে নত হয়ে চৈতীর যখন বিয়ে হয়ে গেলো, বাবু তখন হঠাৎ কানাডা চলে যায় বড়বোন জলির কাছে। এদিকে পারভেজ মিলন মোরশেদ চলে আসে ভিয়েনা। তাই বাবু যেনো একাই হয়ে গিয়েছিলো তখন।

খুব বরফ পরেছে সেইবার সারা অস্ট্রিয়াতে। ক্রিস্টমাসের ছুটিতে পাভেল রাতুল মৃদুলা এবং চৈতীকে রেখে চলে গেলে বাংলাদেশে। সুকুমারকে ফোন করে কাঁদছিলো চৈতী। ঠিক ২৪ ডিসেম্বর সকাল ঠিক দশটা বেজে তিরিশ মিনিটে কলিংবেল বেজে উঠলো!

চৈতী:
হ্যালো!

বাবু:
হ্যালো, দরজা খুলবে প্লিজ! বরফে ডুবে যাচ্ছি।

চমকে যায় চৈতী। চেনা কন্ঠ, চেনা মিনতি। সেই সুরেলা ভাইব্রেশন কথার প্রতিটি অক্ষরে। উপর থেকে দরজা খুলবার বাটন চেপে ধরে এক অদ্ভুত অস্থিরতায় ডুবে যায়। ড্রইংরুমে গিয়ে এক নজর চোখ বুলিয়ে গায়ে শাল জড়িয়ে নিলো। রাতুল মৃদুলা এখনও ঘুম! খুব দ্রুত চুলটা গুছিয়ে দরজার কাছে যেতেই ঘরের দরজায় বেজে উঠলো ঘন্টা। দ্রুত খুলে দিলো চৈতী দরজাটি! চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে সুকুমার আর শ্রাবন্তীর দিকে চৈতী!

সুকুমার:
কিরে, চোখ অমন বড় বড় কইরা কি দেখস?

শ্রাবন্তী:
চমক তুমি একাই দিতে পারোনা, আমরাও পারি!

চৈতী:
আসো আসো, ঘরে ঢুকে সব বোলো।

সুকুমার শ্রাবন্তী ভেতরে ঢুকতেই চৈতী দরজা বন্ধ করে দিলো।

চৈতী:
কিরে, তোদের লাগেজ কই?

সুকুমার:
লাগেজ আছে তার জায়গায়!

চৈতীর ভেতরে কি এক অস্থিরতা ঝড় তুলছিল। ঠিক তখনই ঘরের দরজায় কলিংবেল বেজে উঠলো।

চৈতী:
তোরা একটু বস, দেখি কে এলো!

লুকিং হোল দিয়ে এবার দরজা খোলার আগে চোখ রাখতেই বুকের ভেতর হৃদপিণ্ডের সব শব্দ শুনতে পেলো চৈতী। দরজা খুলে দিলো সে। একেবারে নাগালের কাছে বাবু। তার পিছনে একজন বিদেশীনি এবং ভিয়েনার গানের জগতের একজন অতি পরিচিত মুখ। নামটা চৈতী ঠিক মনে করতে পারলোনা সেই মুহূর্তে!

চলবে…..

ফজলুল বারী বাবু,
১১ জানুয়ারী ২০২২ ইং,
ইলফোর্ড, লন্ডন।

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Close