বিনোদন
স্বপ্ন দর্পণ
এক
চৈতীর দুরন্তপনা গঞ্জের কমবেশী সবাই প্রশ্রয় দেয় কারন সে এলাহী তাকুকদারের বড় মেয়ের জেষ্ঠ্য সন্তান। চৈতীর বয়স যখন সাত তখন প্রথম সে তালুকদার বাড়ির ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা ঐতিহ্য বিশাল বট গাছের মগডালে বসে তালুকদার বাড়ির কোথায় কে কি করছে অবলোকন করতো। ঠিক সন্ধ্যায় সবাই যখন বাড়ীতে ফিরে আসতো সারাদিনের কর্ম ব্যস্ততার শেষে, একেক জনার কাছে গিয়ে খুব মিষ্টি করে সারাদিনের বর্ণনা করে যেতো। অতন্ত্য আশ্চর্য্যের বিষয় কার কাছে কোন সংবাদটি দিতে হবে সে শুধু সেইটুকুই তাকে পরিবেশন করতো। এতে কেউ তার নির্দিষ্ট তথ্যের বাইরে অন্যের তথ্য জানতে পারতোনা!
আরো একটি মজার বিষয় কোনো অসংলগ্ন সংবাদ সে কাউকে দিতনা। এতে পরিবারের কারো সাথেই কখনো ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ ছিলোনা! এইদিকটা বিবেচনায় এনে লেখক হিসেবে চৈতী সম্পর্কে বলতেই হয় সে ছিলো অতন্ত্য বুদ্ধিমতি বালিকা!
আরিফ;
হ্যালো, কেমন আছো? শুনতে পাচ্ছিনা তোমাকে। একটু জায়গা বদল করো। হ্যা, হ্যা, এখন শুনতে পাচ্ছি। তুমি শুনতে পাচ্ছো?
চৈতী:
আমি শুনতে পাচ্ছি। হ্যা জায়গা বদল করেছি, নইলে এই শপে বসে তোমার সাথে প্রেমালাপ সম্ভব!!
আরিফ:
কেমন আছো তুমি?
চৈতী:
তুমি যেমন রেখেছ!
আরিফ:
আবার কি দোষ করলাম আমি?
চৈতী:
কি বলো এইসব? তোমার দোষত্রুটি ধরতে এই বয়সে তোমাকে ভালবেসেছি? তুমি কেমন আছো?
আরিফ:
একা মানুষ আমি, কাজ আর বাসা, এইতো আমার থাকা!
চৈতী:
তোমাকে আর একা থাকতে হবেনা।
আরিফ:
কেনো আমার জন্য পাত্রী দেখেছ নাকি?
চৈতী;
আমাকে ডিঙ্গিয়ে কার এতবড় কলিজা যে তোমাকে সঙ্গী করে!
আরিফ:
তাই নাকি? তাহলে বাড়ীতে সবাইকে জানিয়েছ মনে হচ্ছে?
চৈতী:
না সোনা, এখোনো সময় হয়নি। তুমিতো আমার অতীত সবটাই জানো। সেই দুঃসময়ে আমার বাবা, মা, ভাইবোনেরা পাশে না দাঁড়ালে রাতুল আর মৃদুলাকে নিয়ে আজ কোথায় কিভাবে থাকতাম মনে করতে গেলেই শিউরে উঠি!
বিমান বাহিনীতে যোগ দেয়া চৈতী তার বড় মামার একটা ভুলের কারনে নিশ্চিত পরিকল্পিত ভবিষ্যতকে ডায়েরির পাতায় বন্দী করে ভিয়েনা প্রবাসী বদরুলের ছোট্ট গোছানো সংসারে এসে হাজির হয়! আসলে কি চৈতীর মামার সামান্য ভুল ছিলো চৈতীর জীবনটাকে পাল্টে দেবার জন্য। নাকি আভিজাত্যের লড়াইয়ে কোনো স্বার্থ সিদ্ধি হাসিলের পরিকল্পনা ছিলো আজও উদ্ধার করতে পারেনি চৈতী!
ছোট্ট চৈতী যে বছর ক্লাশ ফাইভে বৃত্তি পেলো, এই বড় মামা আতা তালুকদার সমস্ত এলাকায় মিষ্টির বন্যা বইয়ে দিয়েছিলো। এলাহী তালুকদারে বাড়িতে সাতদিন একটানা মেজবানী চলে সেই আনন্দে। সেই মামা তার সিদ্ধান্ত যখন চৈতীর দুই হাতের মুঠোয় তুলে দিলো, একটি কথাও বলেনি চৈতী। শুধু ইংল্যান্ডে বাবা আর মায়ের কাছে জানতে চেয়েছিলো মামা কেনো এভাবে তার ভবিষ্যতকে তছনছ করে দিচ্ছে?
দুই
পৃথিবীতে কিছু মানুষ জন্ম নেয় শুধু ভোগের নিমিত্তে। আর কিছু মানুষের জন্ম হয় ভোগদারী সেজে অন্যকে সন্তুষ্ট করে নিজেকে মানিয়ে চলায়। এভাবেই পৃথিবীটা একটা ব্যলেন্স এর বিন্দুতে সিন্ধু হয়ে আছে অনাদিকাল থেকে। ভোগদারী হলো নির্যাতিত, ভোগ ভোজনের দল হলো জোতদার, মহাজন, জমিদার, তারও আগের দিকে ফিরে তাকালে রাজা বাদশা, সম্রাট আরো কতকি। এর চাইতে বেশী অতীতকে ঘেঁটে এই লিখা পড়তে আপনাদের বিরক্তির উদ্রেক করতে চাইনা!
গাছের মগডালে চড়েই চৈতীর বালিকাকাল কাটেনি। নদীর মাঝখানে জেলেদের নৌকায় হানা দেয়া, কার বাড়িতে পর্যাপ্ত আমের ছড়াছড়ি, কাদের বাড়িতে একটি কলাগাছও নেই এর সব খবরাখবর জেনে সিদ্ধান্ত নিতো কার থেকে কি নিয়ে কাকে উপহার দেবে! এর জন্য চৈতীর ছিল সাত সদস্যের এক হানাদল। হানাদল আদলে কাউকেই ক্ষতির সম্মুখীন করতোনা। তবে দিনান্তে একটা দুটো অভিযোগের সম্মুখীন চৈতীকে হতেই হোতো। খুব ভালো একজন নেত্রীর গুন চৈতীর ছিলো বলতেই হবে। সে তার হানাদলের কাউকেই কোনোদিন আদালতের সামনে হাজির করতোনা। আর সেইনিয়ে হানাদলে সব সময় চৈতীর প্রতি এক গভীর ভালবাসা কাজ করতো।
সুকুমার ছিলো চৈতীর ডানহাত। এর কারন বিশ্লেষণ করলে সুকুমারকে চৈতীর হুবহু আদলের (দুস্টুমিতে) বললে একটুও ভুল হবেনা! বানরের লেজ ধরে জব্দ করার মত বাঁদর এই হানাদলে চৈতীর পর সুকুমারই ছিলো প্রকৃত ‘বন্দর’! দুর্গা মণ্ডপে গেলবার এক বিশাল সাপ দুর্গা মূর্তিকে জড়িয়ে ফণা তুলে বসে ছিলো। পুজোর হট্টগোলে সেইদিকে কারোরই নজর পরেনি। আর অদ্ভুত ব্যাপার এমন হৈচৈ, এতো মানুষের মাঝখানে কোনো সাপ এভাবে ফণা তুলে থাকতে পারে এমন ধারণাই কেউ করেনি।
মাইকে তখন বাজছে,”হাওয়ামে উড়তা যায়ে” গানটি। চৈতীর বিরক্তির শেষ হয়ে যায় এই গানটি শুনলেই! কেমন এক বাজে অনুভূতি সারা মনজুড়ে কিলবিল করতে থাকে তখন। আর সেই জায়গা থেকে মুক্তির জন্য চৈতী তখন সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উপর মনকে স্থির করবার চেষ্টা করে। এতো অল্প বয়সে এমন ভাব গাম্ভীর্য মানায় না, কিন্তু চৈতীযে জন্মেছে অন্য ধাতুতে।
মাইকে বাজছে,”হাওয়ামে উড়তা যায়ে” অরুর দুই চোখ দুর্গা মায়ের চোখে আটকে আছে। কি অপূর্ব হাতের কাজ নিমাই কাকুর। আশেপাশে এমন মূর্তি শিল্পী খুঁজে পাওয়া যায়না। কানের দুল, নাকের ফুল, গলার হার সবই মাটির গড়া। দুর্গা মূর্তির এবারের শাড়িটি, একি দুর্গার হাতে ফণা তুলে সাপ নড়ছে না!!!
চৈতী:
সুকুমার, এই সুকুমার।
সুকুমার:
কি হইছে? এমন সুন্দর গান বাজতেছে একটু শুনতে দে!
চৈতী:
আরে গান পূজার বাকী দিনগুলা শুনতে পারবি। এখন ঐদিকে দেখ।
বলেই চৈতী সুকুমারকে দেখায় মূর্তির হাত বেষ্টিত সাপ মহারাজকে। সুকুমার তাচ্ছিল্যের সাথে একবার দেখে আমার গানের সাথে মাথা নেড়ে হওয়ামে উড়তা যায়ে উপভোগ করতে থাকে। চৈতী নিজেই মূর্তির দিকে এগোতে শুরু করে ভীড় ঠেলে। হঠাৎ সামনে চেয়ারে বসা বড়মামাকে দেখে চৈতী নিজেকে সাবধান করে। ফিরে যায় নিজের জায়গায়। একি সুকুমার কই!! এদিক সেদিক খুঁজতে থাকে চৈতী সুকুমারকে। খুঁজতে খুঁজতে হানাদলের বাকী সদস্যদের জড়ো করে ঠিক মণ্ডপের পিছনে গিয়ে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে পরে।
কিভাবে সম্ভব এই সময়টুকুর মধ্যে সর্পরানীকে একহাতে পেঁচিয়ে আরেক হাতে ঠিক গলার জায়গাটি চেপে হাসতে হাসতে হানাদলের উপস্থিত আড্ডায় হাজির!
সুকুমার:
চল সম্রাট সর্পকে নদীতে ছেড়ে দিয়ে আসি।
চৈতী:
এই ঘুটঘুটে অন্ধকারে নদীর পার যাওয়া ঠিক হইবো?
আসমা:
চৈতী ঠিকই কইছে, এখন নদীর ঘাটে যাওয়া ঠিকনা!
বুলবুল:
চল সুকুমার তুই আমি আর বাবু মিল্যা যাই। এই মাইয়্যা মানুষ দিয়া কাম হইবো না। চল আমরা বাবুর গান শুনতে শুনতে যাই।
বাবু:
তুলসী দা তুই তুই যাবিতো? এইনে এইডা ধর।
বলেই বাবু তুলসীর হাতে একটা ডুগডুগি ধরিয়ে দেয়। তুলসী এই হানাদলের সবার চাইতে একটু বড়, তাও মাত্র দের বছরের। সবাই তুলসী ডাকে, কিন্ত বাবুর যুক্তিতে কেউ ছয় মাসের বড় হইলেই সেই মানুষটি তার গুরুজন সমতুল্য! অদ্ভুত এক বিচার এই পাগলা বাউল ধরনের বালকটির!
চৈতী:
আসমা, বুলা, তোরা তাইলে মণ্ডপে ফিরাযা আমি এই শয়তানের দলের লগে যাই। ঐ চল রাস্তায় ভুতে ধরলে আমারে কইসনা দোয়া দরুদ পরতে। আর কি মনে করছস তোরা, আমি ডরে তোগোর লগে যাইতে না করছি?
বাবু:
তাইলে কি কারনে না করছিলি? তুইতো আসলেই আমাগোর মইধ্যে সব চাইতে সাহসী!
চৈতী:
মণ্ডপে বড় মামা আমারে দেখছে। বেশি সময় না দেখলে খোঁজাখুঁজি শুরু করবো তাই যাইতে রাজী হই নাই।
বুলা এই দলের সব চাইতে দুর্বল। কিন্তু চৈতীর জন্য তার জীবন বাজি সেই সত্য সবার জানা!
বুলা:
ঐ, তুই কি কোনোদিন দেখছস তোরে ছাইড়া আমরা একলা আছিলাম। (চৈতীকে উদ্দেশ্য করে বলে বুলা) চল আসমা আমরাও যায় এই শয়তান আর শয়তাননীর লগে! যত্তসব বান্দরের লগে ভাব হইছিলো আমগর!
সুকুমার:
বাহ বীর নারী! আর দেরী করিসনাতো। নইলে এই সাপের জোড়া এর খোঁজে বাইর হইলে হগগলের খবর আছে।
তুলসী:
(ডুগডুগিতে বোল তুলতে শুরু করলো) চল, বাবু ধরতো সেই রাধা কৃষ্ণের গানটা!
বাবু:
আমি ভাবছিলাম না এইহালে দিন যাবেরে সুজন নাইয়া, পার করো দুঃখীনি রাধারে!!
সুরে ছন্দে আনন্দে চেনা পথ, চেনা আকাশের নীলে উজ্জ্বল তারা, অর্ধেক চাঁদের মিষ্টি জোছনা, ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ সব নেচে উঠলো। দুরে মণ্ডপের “হাওয়ামে উড়তা যায়ে” মলিন থেকে মলিনতর হয়ে যেতে লাগলো
স্বপ্ন দর্পণ
তিন
হানাদল নদীর খুব কাছাকাছি চলে এসেছে। তখনও গান গাইছিলো বাবু আর ডুগডুগি বাজিয়ে যাচ্ছিলো তুলসী। হঠাৎ পাঁচ ব্যাটারির বড় টর্চের আলো এসে পরলো ঠিক চৈতীর মুখে। হাত দিয়ে মুখ ঢেকে চেঁচিয়ে উঠলো চৈতী। আলো একেবারেই চৈতীর নাগালের মধ্যে। সুকুমার কি মনে করে দল থেকে একটু সরে গিয়ে নিজেকে আড়াল করে দাঁড়ালো। টর্চ হাতে রাইস মিলের মালিক আবুল ব্যাপারীর মাতাল ছেলে কালা বদরুল ঠিক চৈতীর গায়ে পরতে যাবে তখনই সুকুমার সাপের মুখ এনে ধরলো বদ বদরুলের মুখের সামনে।
টর্চের আলো এবার ঠিক সাপের মুখে। আকাশ ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠলো কালা বদরুল। এই সুযোগে বাবু তুলসী বুলবুল একসাথে কালা বদরুলকে লাথি চড় যেমন ইচ্ছে মারতে লাগলো। সুকুমার পুনরায় সাপের লেজ দিয়ে বদরুলের কানে সুড়সুড়ি দিতেই কালা বদ তার মাতলামী ভুলে পাঁচ ব্যাটারীর টর্চ ফেলে দৌড়ে পালাতে গিয়ে পরলো নদীতে। ঘাটে বসে ছিলো পরাণ মাঝি। নদীতে ঝুপ শব্দ শুনে সে তার হারিকেনের আলোয় নদীতে দেখতে পেলো পারাপারের ভাড়া না চুকিয়ে রাইস মিলের বড়বাবুর মাতাল ছেলে হাবুডুবু খাচ্ছে পানিতে। পারে দাঁড়িয়ে থাকা হানাদলকেও দেখতে পেলো পরাণ মাঝি হারিকেনের আলোয়।
চৈতী:
পরাণ দাদা না?
পরাণ মাঝি:
হ’বুজি। তোমরা এতো রাইতে এইখানে কি করো?
একটু আগে এই বদটা আমারে ভাড়া না দিয়া নৌকার থেইক্যা নাইমা গেছে। পানিতে পরলো কেমনে?
চৈতী:
সে অনেক কথা দাদা, তুমি কি একটু তুলবা এই বদটারে?
পরাণ মাঝি:
নিশ্চয়ই বুজি। মানুষ হইয়া মানুষের বিপদে না দাঁড়াইলে আর এই জনম নিয়া কি লাভ হইলো!
বুলবুল:
দাদা একটু জলদি করো, নইলে মাতালে অক্কা পাইবো কইলাম!
পরাণ মাঝি তার হাতের হারিকেন রেখে পানিতে নেমে পরলো। ঋতুর পরিবর্তনের কারনে নদীর ঘাটে তেমন গভীরতা নেই। দাঁড়িয়েই থাকা যায় এখানটায়। কিন্তু মদের বদৌলতে আর ভয়ে কালা মিয়া হাটু পানিতেই ডুবউঠ করছিলো। জোছনার আলোয় তাকে মনে হচ্ছিলো কান ধরে উঠবস করছে।
বুলা:
ঐ চৈতী, সুকুমার কইরে?
সবাই এর ওর দিকে জোছনার হালকা শুভ্র আলোয় দেখলো একবার! সবাই আছে, শুধু সুকুমার নেই।
চৈতী:
(চিৎকার করে) সুকুমার, এই সুকুমার।
চৈতীর সাথে সাথে সবাই এদিক সেদিক মুখ করে ডাকতে লাগলো! না কোনো সাড়াশব্দ নেই! চৈতীর কাঁন্না পেয়ে গেলো। আসমার হাত ধরে ফিসফিস করতে লাগলো অরু! আসমা কিছুই বুঝতে পারছিলোনা। এক ঝাঁকি দিয়ে চৈতীকে জিজ্ঞেস করলো।
আসমা:
এই চৈতী, বিড়বিড় করে কি বলিস?
চৈতী:
সুকুমার কি সাপের কামড়ে মরে পানিতে ভেসে গেলো!
আসমা:
কি আবোলতাবোল কথা। আয় একটু খুঁজি আগে!
সবাই সুকুমারকে খুঁজতে লাগলো। নেই কোথাও নেই সুকুমার! বুলা, আসমা, চৈতী কাঁদতে শুরু করলো। তিনজনেরই এবার মনে হতে লাগলো সুকুমারকে সাপ সম্রাট সুযোগ বুঝে খতম করে দিয়েছে। কঠিন বিপদের মুখে জাহাজের কাপ্তান যেমন সকলের উদ্দেশ্যে নির্দেশনা পাল্টে নতুন উপযোগী সিদ্ধান্ত দেন, ঠিক তেমনি হানাদলের কিশোরী পদার্পিত চৈতী কাঁদতে কাঁদতেই তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিয়ে বাবুকে পাঠিয়ে দিলো মণ্ডপে। যেনো বাবুর উপস্থিতিতে সবাই বুঝতে পারে সাত সংগ্রামী আশেপাশেই আছে। বাবু প্ৰথমে যেতে রাজি হয়নি। পরে চৈতীর কাঁন্নাস্নাত অনুরোধে সে দৌড় লাগায় মন্ডপ অভিমুখে। অন্যদিকে বুলবুল ও তুলসী কান্তা নদীর পার ধরে কখন শ্মশান ঘটে উপস্থিত হয়েছে বুঝতেই পারেনি।
বুলবুল:
এই তুলসী এতো শ্মশান ঘাটরে। ভুতের হাতে পরলাম নাকি তুলসী?
তুলসী:
ঐ, একটু থাম। ঐ দেখ কে জানি চিতার আগুনের উপর বইসা আছে!
বুলবুল:
আল্লহরে আমারে বাঁচাও!
বুলবুল তুলসীকে জাপটে ধরে। তুলসী ধাক্কা দিয়ে বুলবুলকে সরিয়ে দেয়!
তুলসী:
হায়রে ভীতুর ডিম। দিনের আলোয়তো খুব বাহাদুরী দেখাস, এখন শয়তানের ভয়ে নিজে শয়তান হইয়া আল্লাহরে ডাকস!
হঠাৎ কে যেনো তুলসীকে ধাক্কা দিয়ে শ্মশানে গচ্ছিত পোড়া খরকুটোর উপর ফেলে দেয়। বুলবুল সেই একই ধাক্কায় ছিটকে পরে আরেক প্রান্তে! একি হচ্ছে এবার সাহসী তুসলীর মুখ দিয়ে বিড়বিড় করার মত বের হয়ে এলো। বুলবুল জ্ঞান হারিয়েছে। তুলসীর তখনও চেতনায় অক্সিজেন জমা আছে। সে খুব সাবধানে বুলবুলকে ঠিক যেখানে মরা পোড়ানো হয় সেই উঁচু আসনে গিয়ে পেলো। বুলবুলকে ধরতেই তুলসী বুঝে গেলো হানাদলের আরেক সাহসী বীর ভয়ে কুপোকাত। না, এভাবে ভয় পেয়ে বসলে আরো না জানি কি অঘটন ঘটে। সদ্য কিশোর তুলসী তার বন্ধু বুলবুলকে তুলে দাঁড় করবার চেষ্টা করলো।
একি এমন ভারী হয়ে গেলো কিভাবে এই তালপাতার সেপাই! চট জলদি তুলসী বুলবুলের নাকের কাছে কান নিয়ে নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পেয়ে আর দেরী করলোনা। এক ঝটকায় কাঁধে তুলে নিলো তুলসী বুলবুলকে। দৌড়াতে চেষ্টা করলো তুলসী, পা ভারী হয়ে আসতে লাগলো। দেহের সমস্ত শক্তি কান্তা নদীর স্রোতে ভেসে যাচ্ছে যেনো। উপায়ন্ত না দেখে কৃষ্ণনাম জপতে শুরু করে দিলো তুলসী। অদ্ভুত এক বিষয় এই নাম জপের সাথে তুলসীর সাহসের গতিতে যেনো কালবৈশাখী হাওয়া জুড়ে বসে। হলোও তাই। আলাদীনের দৈত্যের মত উড়াল দিয়ে ছুটতে লাগলো তুলসী, কাঁধে অচেতন বুলবুল।
চৈতী, আসমা বুলা, তুলসী বুলবুলের সারা না পেয়ে ঘাবড়ে যায়! এমন ঘটনার সম্মুখীন এই সাত জনের হানাদল কোনোদিন পরেনি। তিন কন্যা একে অন্যের হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। পরাণ মাঝি কালা বদরুলকে পানি থেকে তুলে পারে বসিয়ে রেখে হানাদলকে খুঁজতে এসে দেখে ওরা তিনজন জড়সড় হয়ে কাঁপছে!
পরাণ মাঝি:
বুজি কি হইছে তোমাগর, এইভাবে কাঁপাতেছ কেন?
তিন কন্যা যেনো প্রাণের সারা পেতে লাগলো। একসাথে পরাণ মাঝিকে তিনজন জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠলো। পরাণ মাঝি তিনজনকে সন্তানসম আঁকড়ে ধরে রাখলো তার হাতের ছোঁয়ায়! তিনকুলে ছিলো তার মিষ্টি সোনা বউ লক্ষ্মী আর দুই কন্যা এক পুত্র। উনসত্তুরের জলোচ্ছাস তাকে কুলহারা করে দিলে এই গঞ্জে এসে আশ্রয় নেয় পরাণ মাঝি। এলাহী তালুকদার নিজের বাড়িতে রেখে কিনে দেন একখান নৌকা। সেই নৌকার যাত্রী ছিলো তালুকদার বাড়ির বউ ঝিয়েরা। পরিবারের সদস্য হয়েই কাটছিল দিন। কিন্তু তালুকদার সাহেব যুদ্ধের বছরের পর যুদ্ধজয়ী মুক্তিযোদ্ধা পরাণকে তার পাটের অরতে কাজ শিখতে নিয়ে যায়। অল্প কিছুদিনেই এলাহী তালুকদার বুঝে নেয়, নদীর প্রেমিক পরাণ মাঝি পারের বৈষয়িক ব্যাপারে একেবারেই আগ্রহী নয়। আর আগ্রহ তার হবেইবা কিভাবে। যে নদী তার সংসার কেড়ে নিয়েছে তার উপর তার টান থাকতেই পারে বুঝতে পারে গঞ্জের মহানুভব এলাহী তালুকদার।
নতুন একটি খেয়া নৌকা কিনে দিয়ে মুক্তি দেয় এলাহী তালুকদার পরাণ মাঝিকে। শুধু পুত্র স্নেহের বশে তার জন্য এলাহী তাকুকদারের এই বাড়ির উপর যে তার পূর্ন অধিকার আছে সেই কথা সে ভুলে না যায়।
তুলসীকে দেখে চৈতী, বুলা, আসমা পরাণ মাঝিকে ছেড়ে দৌড়ে যায় তুলসীর কাছে। কাঁধ থেকে বুলবুলকে নামিয়ে হাঁপাতে থাকে তুলসী। পরাণ মাঝি কারো কোনো কথার তোয়াক্কা না করে নৌকায় উঠিয়ে ঘাট থেকে নৌকা ছাড়তেই সুকুমারকে দৌড়ে আসতে দেখে। আবার ঘাটে ভেড়ায় নৌকা পরাণ মাঝি। হালকা চাঁদের আলোয় সুকুমারের সদ্য কৈশোর দীপ্ত হাসিতে সবাই অবাক হয়ে যায়। কারো মুখেই কোনো সারা নেই। অধিক শোকে মানুষ যেমন পাথর হয়ে যায় ঠিক তেমনি পরম পাওয়ায়ও মানুষের মধ্যে এক ধরনের নীরব সুখানুভূতি ছেয়ে যায়। কান্তা নদীতে উত্তাল স্রোতে সাঁতরে বেড়ানো সাত সাঁতারুর ছয় সাঁতারুকে নিয়ে পরাণ মাঝি চলেছে পূজা মন্ডপের ঘাট অভিমুখে।
গঞ্জের এই দুর্গা পুজোর নবমিতে বিশাল আয়োজন করা হয় মন্ডপ মঞ্চে। গোপাল গঞ্জের আদি দীপালি অপেরা আজ “বাংলার বন্ধু শেখ মুজিব” পালা করতে আসছে। পূজার এই আয়োজনটির সমস্ত ব্যয়ভার বহন করেন এলাহী তালুকদার! তাই আজ চৈতী এতকিছুর পরেও বাড়ির দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত।
চাঁদের অবয়ব শান্ত কান্তার পানিতে পরাণ মাঝির নৌকার ঢেউয়ে দুলতে দুলতে একই সাথে এগিয়ে চলে। দুরে কার বাঁশিতে বিরহী শিব রঞ্জনী বাজছে জানেনা চৈতী। সদ্য এই কিশোরীর বুকের ভেতরে শুধু একটি সুর গুনগুন করে মিষ্টি কেমন কষ্টের জানান দিচ্ছে। বাবুর পাগলাটে মুখটা চাঁদের অবয়বে দেখতে পেয়ে এক ভালোলাগা অজান্তে মনের গভীরে নাড়া দিতে লাগলো।
চলবে………
ফাজলুল বারী বাবু,
৯ জানুয়ারী ২০২২ ইং,
সকাল, ইলফোর্ড, লন্ডন।



