সাহিত‌্য

নগ্নতা থেকে সভ্যতা—আবার কি উল্টো পথে যাত্রা?

মুমতা হেনা মীম,

মানুষ— শব্দটির মধ্যেই অদ্ভুতরকম সৌন্দর্য আর পবিত্রতা লুকিয়ে আছে। মানুষকে বলা হয় আশরাফুল মাখলুকাত, সৃষ্টির সেরা জীব, সেই মানুষই যখন ধীরে ধীরে তার মানবিকতাকে বিসর্জন দেয়, নগ্নতাকে বেছে নেয়, হুশ-জ্ঞান হারিয়ে পশুত্বকে বেছে নেয় তখন এই সভ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়, আমরা কি তবে সভ্যতার উল্টো পথে হাঁটছি? আমরা কি আদৌ সভ্য হয়েছি?

ইতিহাস বলে সভ্যতার সূচনা হয়েছিল নগ্নতা থেকে—শারীরিক ও মানসিক দুই অর্থেই। সময়ের প্রবাহে আমরা শিখেছি আচ্ছাদন, অনুশাসন, ন্যায়বোধ, সৌজন্য। কিন্তু আজকের সমাজ দেখে মনে হয় সেই ঘড়ির কাঁটা উল্টো ঘুরছে। নগ্নতার দিকে, বর্বরতার দিকে, পশুত্বের দিকে আমরা আবার ছুটে চলেছি—অসুস্থ এক প্রতিযোগিতায়।

পৃথিবী সত্যিই এক গভীর নৈতিক সংকটে। মানুষ হত্যা করছে মানুষকে—কেবল নিজেদের স্বার্থের জন্য, অর্থের জন্য, প্রভাবের জন্য, ক্ষমতার জন্য। এক জাতি অন্য জাতির উপর হামলা করছে, এক দল আরেক দলকে নিশ্চিহ্ন করতে মরিয়া, এক ধর্মের মানুষ অন্য ধর্মকে ছোট করছে, মারামারি, হানা-হানি! কোথাও যেন শান্তি নেই! শান্তি নেই সমাজে, শান্তি নেই পরিবারে! পিতা হত্যা করছেন সন্তানকে, ভাই ভাইকে পেছন থেকে ছুরি মারছে, মা গলা টিপে মেরে ফেলছেন নিজের শিশুকে। একদিকে মানুষ চাঁদে যাচ্ছে, অন্যদিকে মানুষ পাথর দিয়ে পিষ্ট করছে আরেক মানুষকে। এই কি সভ্যতা? সভ্যতার মানে এমন?

মাদকের জন্য সন্তান খুন করছে পিতামাতাকে। অকারণেই ঠুকে দিচ্ছে মামলা‌। হতাশা আর নিঃসঙ্গতার চাপে আত্মহত্যা হয়ে উঠেছে স্বাভাবিক সংবাদ। তরুণরা শিক্ষিত হয়েও জড়িয়ে পড়ছে অপরাধজগতে—ছিনতাই, ধর্ষণ, খুন, সন্ত্রাস কিংবা মাদকাসক্তির চোরাবালিতে। নৈতিক শিক্ষা কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছে, মূল্যবোধ বিলীন প্রায়। রাষ্ট্র আর সমাজ কেবলই নিরব দর্শক । আর এই নিরবতাই আমাদের ধ্বংসের কারণ। আমরা আমাদের শিক্ষাকে ভুলে গিয়ে, মানবিকতাকে বিসর্জন দিয়ে পশুত্বকে কেমন স্বাভাবিক করে ফেলছি, চুপচাপ মেনে নিয়ে পাশ কেটে যাচ্ছি, দায় এড়িয়ে যাচ্ছি, যেন আমাদের কিছুই করার নেই! আসলেই কি আমাদের কিছুই করার নেই?

খুব অস্থির একটা প্রজন্ম গড়ে উঠছে। মানুষ যদি শুধুমাত্র ক্ষমতা-অর্থ-সম্পদ ভোগ করাকে সাফল্যের মানদণ্ড ধরে নেয়—তখন মানবিক গুণাবলি হারিয়ে যায় অনিবার্যভাবে। ধৈর্য, সৌজন্য, দেশপ্রেম, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ- এখন ফেলে রাখা পরিত্যক্ত পাঠ্যবইয়ের মতো অবহেলিত।

কোনো জাতি তখনই ধ্বংস হয়, যখন তার চারিত্রিক ভিত্তি নষ্ট হয়ে যায়। রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনা, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, রাজনৈতিক দলীয়করণ, ঘুষ, দখল, দুর্নীতি—এসব যেন আজ আমাদের দৈনন্দিন চালচিত্র। আমরা সবাই জানি, কিন্তু কেউ কিছু বলি না, হয়তো ভয়ে নয়তো স্বার্থে। আবার কেউ মুখ খুললে, তাকে যেকোনো মূল্যে থামিয়ে দেয়া হয়।

যদি বাংলাদেশের কথা বলি, আমরা অনেক আগেই স্বাধীনতা পেয়েছি, কিন্তু আমরা আদৌ কি স্বাধীন হয়েছি? নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, নিরপেক্ষতা—এসব তো এখনো অনিশ্চিত । সমাজে আদর্শ নেই, রাষ্ট্রে ন্যায় নেই, পরিবারে বন্ধন নেই। আসলে মুক্তি কোথায়? আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যত কি আদৌ নিরাপদ?

এইযে সামাজিক অবক্ষয় হচ্ছে, এজন্য আমরা সবাই দায়ী—পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র, গণমাধ্যম, এবং সমাজপতিরা। আমরা শুধু উপদেশ দিতেই পারি, কিন্তু সত্যিকার অর্থেই পাশে দাঁড়াতে পারি? ভালোবাসা আর দায়িত্বের অনুপস্থিতিতে তরুণ প্রজন্ম হারিয়ে যাচ্ছে—অন্ধকারে।

কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, এ তরুণ প্রজন্ম দ্বারা নতুন কিছু করা সম্ভব, ভালো কিছু করা সম্ভব। এই বিষাক্ত সময়ের মধ্যেও কিছু স্বচ্ছ আলো আছে, কিছু হৃদয়ের মানুষ এখনো জেগে আছে। যদি আমরা চাই, তাহলে সমাজকে আবারও ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এজন্য কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা অতীব জরুরি।

১. পারিবারিক নৈতিক শিক্ষার পুনর্জাগরণ

পরিবার হোক নৈতিকতা ও মানবিকতার আঁতুড়ঘর। প্রতিটি বাবা-মা যেন কেবল অর্থ উপার্জনের যন্ত্র না হয়ে বরং হন সন্তানদের আদর্শ ও আস্থার ভরসাস্থল।

নৈতিক শিক্ষা, মূল্যবোধ চর্চার শুরু যেন হয় ঘর থেকেই!

২. শিক্ষার মানবিক রূপান্তর

শিক্ষাকে  চাকরিমুখী ডিগ্রি নয়, বরং মানবিকতা ও সৃজনশীলতা চর্চার ক্ষেত্র বানাতে হবে। সাহিত্য, শিল্প, দর্শন, বিতর্ক—এসব শিক্ষার সাথে জুড়ে দিতে হবে অন্তর্জাগরণ।

৩. আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে

দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, বিচারহীনতার অবসান এবং দলনিরপেক্ষ প্রশাসন গড়তে হবে। সমাজকে রক্ষা করতে হলে রাষ্ট্রকে হতে হবে আগুয়ান—দর্শক নয়!

৪. তরুণদের সঠিক গাইডলাইন দিতে হবে

তরুণদের শুধু দোষ দিয়ে নয়, তাদের সুযোগ দিতে হবে গড়ার। উদ্যোক্তা হতে সহায়তা করতে হবে, কর্মসংস্থানের নতুন পথ এবং মানসিক শক্তি গড়ার সুযোগ করে দিতে হবে।

৫. গণমাধ্যমকে হতে হবে ইতিবাচক

আজকালকার পেপার পত্রিকার নিউজ করার ধরণ কেমন যে হয়ে গেছে, সস্তা সেলিব্রিটি নিয়ে মাতামাতি, অসুস্থ বিনোদন চর্চা হচ্ছে হরহামেশাই ।

গণমাধ্যম হোক আশার কথা বলা পত্রিকা, গঠনমূলক চিন্তার প্ল্যাটফর্ম—যেখানে মানুষের গল্প থাকবে, প্রতিরোধের কাহিনি থাকবে, ভালোবাসা থাকবে।

 

এ সমাজ আমাদের। প্রত্যেকে হোক একেকজন আলো হাতে থাকা পথিক। প্রতিবাদ করো, রুখে দাঁড়াও, উদ্যোগ নাও, এগিয়ে চলো —এই হোক লক্ষ্য।

সমাজ পরিবর্তন কোনো ম্যাজিক নয়। এটা সময়সাপেক্ষ, কষ্টসাধ্য, কিন্তু অসম্ভব নয়। আমাদের ভবিষ্যৎ আজ দুলছে দোলাচলে—কিন্তু আমরা যদি এখনই না জাগি, তবে কাল হয়তো আর জাগার সুযোগ পাবো না।

একটি জাতি তখনই সত্যিকার অর্থে সভ্য হয়, যখন তার মানুষ মানুষ হয়ে ওঠে।

আর সভ্যতা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন নগ্নতা নয়—নৈতিকতা আর মানবিকতাই হয় তার প্রকাশ।

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Close