সাহিত‌্য

শিল্প মানুষের আত্মার অনুরণন যা তাকে বাঁচিয়ে রাখে তার অস্তিত্বে

আমার লোভ মৃত্যুর পরও মানুষের ভালোবাসায় বেঁচে থাকা।

কবি, আবৃত্তিশিল্পী, অভিনেত্রী ও সংবাদপাঠক এই চার পরিচয়ের সমন্বয়ে ফারজানা করিম গড়ে তুলেছেন তাঁর বহুমাত্রিক শিল্পজগৎ। সম্প্রতি যুক্তরাজ্য ভ্রমণের সময় তিনি শিল্প, সমাজ ও ব্যক্তিজীবন নিয়ে নিজের অনুভব ও অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন নতুনদিন এর সাহিত্য সম্পাদক সৈয়দ আনোয়ার রেজার সঙ্গে।

নতুনদিনের পাঠকদের জন্য তাঁর সেই কথোপকথন প্রকাশ করা হলো।

রেজাঃ আপনি একাধারে কবি, আবৃত্তিশিল্পী, অভিনেত্রী ও সংবাদপাঠক। শিল্পের এতগুলি পরিচয়ের মধ্যে নিজেকে মূলত কোন পরিচয়ে দেখেন বা কীভাবে নিজের শিল্পীসত্তাকে সংজ্ঞায়িত করেন?

ফারজানা করিম: সব মাধ্যমই আমার ভালো লাগার, ভালোবাসার। কারণ ভালো না বাসলে যত্ন নেওয়া যায় না আর যত্ন ছাড়া কোনো কাজই মানুষের হৃদয়ে গেঁথে থাকে না । আমার লোভ মৃত্যুর পরও মানুষের ভালোবাসায় বেঁচে থাকা। তাই যেসব মাধ্যমে কাজ করেছি সবই ভালোবেসে করেছি ।এমনকি আমার ছাত্রছাত্রীদেরও কোনোদিন অযত্নে পড়াইনি।

সব সন্তানই মায়ের কাছে সমান প্রিয়, তবুও কোনো এক সন্তানের প্রতি বিশেষ টান থেকে যায় তেমনি আমার ক্ষেত্রেও। মঞ্চনাটকে অভিনয়ের প্রতি সেই টান আমার ।

কবি হেলাল হাফিজ যতদিন বেঁচে ছিলেন অসাধারণভাবে আমাকে অনুপ্রাণিত করেছেন।

রেজাঃ আপনার শিল্প জীবনের শুরুটা কীভাবে হয়েছিল?

ফারজানা করিম: আমার শিল্প জীবনের শুরুটা হয়েছিল স্কুল থেকে, তৃতীয় শ্রেণিতে পড়াকালীন এক ইংরেজি গল্পের মঞ্চায়নের মাধ্যমে। সেই নাটকের জন্য প্রয়োজন ছিল একটি ছোট্ট সাদা গাউন। আমার আম্মা অনেক কষ্ট করে সেই কস্টিউম জোগাড় করে দিয়েছিলেন। সেই মুহূর্তটি আজও আমার মনে গেঁথে আছে।

এরপর একের পর এক বিতর্ক প্রতিযোগিতা, উপস্থিত বক্তৃতা এবং অনুষ্ঠান উপস্থাপনায় অংশগ্রহণ করতে করতে আমার মঞ্চ ও মাইক্রোফোন ভীতি সম্পূর্ণ কেটে যায়। ধীরে ধীরে আমি আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠি।

অবশেষে ১৯৯৪ সালে আমি সম্পূর্ণরূপে মঞ্চনাটকে নিজেকে যুক্ত করি এবং সেখান থেকেই শুরু হয় আমার শিল্পজীবনের প্রকৃত পথচলা।

রেজাঃ কবিতা লেখার পেছনে অনুপ্রেরণা কী ছিল?

ফারজানা করিম: কবিতা লেখার পেছনে অনুপ্রেরণা ছিলেন কবিরাই। বিশেষ করে কবি হেলাল হাফিজ তিনি যতদিন বেঁচে ছিলেন অসাধারণভাবে আমাকে অনুপ্রাণিত করেছেন। আর সবচেয়ে বড় প্রেরণার উৎস হচ্ছেন আমার সম্মানিত ফেসবুক পাঠকেরা।

রেজাঃ আপনার কাছে কবিতা কী?

ফারজানা করিম: কবিতা আমার কাছে হলো অল্প শব্দে নানা অনুভূতির প্রকাশ। কখনো সামান্য দু’টি লাইনই অসংখ্য শব্দের গভীরতা সৃষ্টি করে। লেখালেখির সব মাধ্যমের ভেতর কবিতাতেই আমি সবচেয়ে বেশি সাবলীল।

রেজাঃ কবিতার কারণে আপনি কোনো ব্যক্তিগত বা সামাজিক সংকটের সম্মুখীন হয়েছেন? আপনার সৃষ্টিকর্ম কি কেবল শিল্পের জন্য শিল্প নাকি এর গভীরে লুকিয়ে থাকা বার্তা সমাজের জন্য বিশেষ অর্থবহ?

ফারজানা করিম: কবিতায় কখনো লিখেছি পরকীয়া প্রেম, কখনো দুষ্ট রাজনীতি, কখনো একাকীত্ব এমন আরও নানা বিষয়। কিন্তু প্রতিবারই মানুষ আমার লেখাকে আমার ব্যক্তিজীবনের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেছেন।

একজন নারী হয়েও পুরুষের ভাষা বা অনুভূতি কবিতায় ফুটিয়ে তুলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি আর এই কারণেই অনেকে বিভ্রান্ত হয়েছেন।

তবে আমার সৃষ্টি কখনোই কেবল শিল্পের জন্য শিল্প নয়। বারবার আমার মাকে নিয়ে লিখি। অনেকেই এটিকে ন্যাকামো বলেন। কিন্তু আমার উদ্দেশ্য একটাই যেন আমার লেখা পড়ে অন্তত একজন মানুষ তার মাকে একটু বেশি সময় দেয়, একটু বেশি ভালোবাসে ও যত্ন নেয়। কারণ মা একবার হারিয়ে গেলে আর ফিরে পাওয়া যায় না সেই আদর।

রেজাঃ আবৃত্তি শিল্পে আপনার ভাবনা কী? এটি কি হারিয়ে যাচ্ছে?

ফারজানা করিম: আবৃত্তিশিল্প হারিয়ে যাচ্ছে না, তবে নানা প্ল্যাটফর্মের ভিড়ে তার স্বকীয়তা কিছুটা ম্লান হয়ে পড়ছে। আবৃত্তিশিল্পীর সংখ্যা বেড়েছে বটে কিন্তু মানোন্নয়নের জন্য আরও সচেতন প্রচেষ্টা প্রয়োজন। আমাদের ভাবতে হবে এই শিল্পকে নতুন প্রজন্মের কাছে কীভাবে আরও গভীরভাবে পৌঁছে দেওয়া যায়।

আমি একসময় আবৃত্তিকে কেবল কণ্ঠের জাদুতেই সীমাবদ্ধ রাখিনি। আমার অভিজ্ঞতায় আবৃত্তি তখনই পূর্ণতা পায় যখন তা মঞ্চসজ্জা, আলো, সুর, এমনকি সুগন্ধের মতো ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য উপাদানের সাথে মিলিত হয়। একটি দু’ঘণ্টার একক আবৃত্তি অনুষ্ঠানে আমি মঞ্চসজ্জা, আলোক প্রক্ষেপণ এবং সুরের সংযোজন করেছি। আবৃত্তি শুরুর আগে হলরুমে ছড়িয়ে দিয়েছি বকুল, বেলী কিংবা রজনীগন্ধার সুবাস। কখনো কেবল আবৃত্তিই করিনি, দর্শক শ্রোতার সঙ্গে সরাসরি কথোপকথনেও জড়িয়েছি।

আমার লক্ষ্য ছিল একটাই আবৃত্তিকে জীবন্ত করে তোলা এবং মানুষের অন্তরের গভীরে পৌঁছে দেওয়া।

রেজাঃ মঞ্চ বা পর্দায় অভিনয়ের অভিজ্ঞতা কেমন?

ফারজানা করিম: আগেই বলেছি মঞ্চাভিনয় আমার ভীষণ প্রিয়। পর্দার কাজ তেমন টানে না বারবার কাট শুনতে শুনতে অনেক সময় খেই হারিয়ে ফেলি। আমার প্রথম মঞ্চাভিনয়ের হাতেখড়ি হয়েছিল বিখ্যাত নাট্যকার ও লেখক প্রদীপ দেওয়ানজীর হাত ধরে। ১৯৯৪ সালে তিনি সেই ছোট্ট আমায় ভরসা করেছিলেন, শ্রদ্ধেয় বাদল সরকারের লেখা পাগলাঘোড়া নাটকে একসাথে পাঁচটি ভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করার সুযোগ দিয়ে। তখন থেকেই মঞ্চই আমার আসল ঠিকানা, আর আজও অভিনয় থামাইনি।

পুরুষদের নোংরা যৌন আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে প্রতিটি মাধ্যমে লড়াই করতে হয়েছে।

এই অভিনয়ের শিক্ষা আমায় এতটাই সমৃদ্ধ করেছে যে এক সময় বুঝতে পেরেছি শিল্পের যেকোনো মাধ্যমেই অভিনয় জানাটা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

রেজাঃ কবিতা ও সাংবাদিকতার মধ্যে কোনো সৃজনশীল দ্বন্দ্ব অনুভব করেন কী?

ফারজানা করিম: কবিতা আর সাংবাদিকতা দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন মাধ্যম।
কবিতায় আবেগের চর্চা আর সাংবাদিকতায় কেবল বাস্তবতার উপস্থাপন।
তবে কবি হলে সংবাদ পড়তে সত্যিই কিছুটা অসুবিধা হয়,
কারণ আবেগ সংবরণ করতে বেশ কষ্ট পেতে হয়।

রেজাঃ আপনার প্রিয় কবি কে?

ফারজানা করিম: আমার প্রিয় কবি অনেকেই।
প্রথম প্রেম রবিঠাকুর ,ঈর্ষণীয় এইজন্যই যে মানুষের জীবনের প্রায় সমস্ত অনুভূতি তিনি লিখে গেছেন।
আমরা আজ কেবল তারই পুনরাবৃত্তি করছি।
তরুণ প্রজন্মের অনেকের লেখাও মন ছুঁয়ে যায়।
আমার হৃদয়ে তাই জায়গা করে নিয়েছেন অনেক, অনেক প্রিয় কবি।

রেজাঃ আবৃত্তি শিল্পের বর্তমান ধারার প্রতি আপনার মূল্যায়ন কী? প্রযুক্তির এই সময়ে এটি কতটা প্রাসঙ্গিক?

ফারজানা করিম: বর্তমান প্রজন্মের কাছে আবৃত্তিকে বাঁচিয়ে রাখতে একে আকর্ষণীয় করে তোলা অত্যন্ত জরুরি।
ইদানীং ইউটিউবে সুন্দর ভিডিওসহ আবৃত্তি করা বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
লেখা ও পাঠ যদি সুন্দর হয়, তবে আবৃত্তি শিল্পকে ঘিরে আরও অনেক কাজ করা সম্ভব।

রেজাঃ গত কুড়ি বছরে সামাজিক ও সাহিত্যিক পরিবর্তনগুলো আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

ফারজানা করিম: সবকিছুই পরিবর্তনশীল আর পরিবর্তন একধরনের চ্যালেঞ্জও বটে।
সবাই পরিবর্তনকে গ্রহণ করতে পারে না, আর তা ধরে রাখতেও লাগে প্রচুর পরিশ্রম।

আমি যখন নিজের লেখা কবিতা আবৃত্তি শুরু করি, তখন অনেক কথাই শুনতে হয়েছে।
অনেকে ভেবেছেন, স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি হয় না,ওটা নাকি শুধু পাঠ।
আমার হলরুমে কতজন শ্রোতা আসেন, সেটাই ছিল অনেকের কৌতূহল।

তবু আমি থামিনি, আর থেমে যাননি আমার হাজারো শ্রোতাও।
তাদের উৎসাহে আমি নিজের লেখাকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছি।
আজ মনে হয় সত্যিই কিছুটা পেরেছি।

রেজাঃ একজন নারী হিসেবে শিল্প-সংস্কৃতির জগতে আপনার পথচলা কতটা চ্যালেঞ্জিং ছিল?

ফারজানা করিম: বাংলাদেশের একজন নারী যে সব সমস্যার সম্মুখীন হন আমিও সেসব সমস্যারই মুখোমুখি হয়েছি।
বিশেষ করে পুরুষদের নোংরা যৌন আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে প্রতিটি মাধ্যমে লড়াই করতে হয়েছে।
এই কারণেই হয়তো অনেক কাজ করা সম্ভব হয়নি, অনেকবার কষ্ট নিয়ে ফিরে আসতে হয়েছে।

আজও ততটা শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারিনি যে শক্তি দিয়ে আমার পরবর্তী প্রজন্মকে এই নোংরা পুরুষতান্ত্রিক পরিবেশ থেকে রক্ষা করতে পারব।
তবু স্বপ্ন দেখি,একদিন আমার সন্তানেরা পারবে।

রেজাঃ আপনি কি মনে করেন, বর্তমানে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সাহিত্যচর্চা ও সংস্কৃতিবোধে ভাটা পড়েছে?

ফারজানা করিম: প্রজন্ম বদলেছে, কিন্তু কেউ কি রবীন্দ্রনাথকে ভুলতে পেরেছে? পারেনি।
একসময় রবীন্দ্রনাথ নিজেই গান গাইতেন। তাঁর সেই গানের সঙ্গে আজকের রবীন্দ্রসঙ্গীতের আকাশ পাতাল পার্থক্য।

তবু মূল সৃষ্টিকে শ্রদ্ধায় রেখে পরিবেশনে পরিবর্তন আনা গেলে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে অনেক কিছু টিকিয়ে রাখা সম্ভব।
আমার বিশ্বাস, সুন্দর শিল্প তাই আজীবন টিকে থাকবে।

রেজাঃ ভবিষ্যতের বাংলাদেশ কেমন দেখতে চান একজন কবি ও শিল্পীর চোখে?

ফারজানা করিম: ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে দেখতে চাই দেশপ্রেমে ভরা এক প্রজন্মের হাতে।
সুদূর বিলেতে এসে সবচেয়ে ভালো লেগেছে এখানকার মানুষের দেশপ্রেম।
শুধু এই একটি গুণই আমাদের উপহার দিতে পারে একটি সুন্দর বাংলাদেশ।

রেজাঃ আপনার অভিজ্ঞতায় যুক্তরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে বাংলা সাহিত্যচর্চার ধারা কেমন? তারা কি একে শুধুই অতীতের স্মৃতি হিসেবে মনে করে, নাকি এখনো এর সৌন্দর্য ধারণ করে নতুন সাহিত্য সৃষ্টির চেষ্টায় যুক্ত রয়েছেন?

ফারজানা করিম: যুক্তরাজ্যে এ আমার প্রথম সফর।
ম্যানচেস্টারে আবৃত্তির অনুষ্ঠান করতে গিয়ে যাঁরা আমার আয়োজনকে সমৃদ্ধ করেছেন, তাঁদের প্রতি আমি শ্রদ্ধায় অবনত।

তাঁদের কথায় বুঝেছি দূরে চলে গেলে মানুষ আসলে আরও বেশি করে আপনজনকে আঁকড়ে থাকে।
বাংলা ভাষাকে আমি বাংলাদেশে যতটা ভালোবাসতে দেখিনি, তার চেয়ে বেশি ভালোবাসা ও চর্চা দেখেছি এখানে, এই মাটিতে।

এখানে নেই চিৎকার, নেই ঝগড়া, নেই ঈর্ষার হিংসা।
আছে শুধু সহস্র ভাষাভাষী মানুষের মাঝে এক টুকরো মিষ্টি বাংলাদেশকে বাঁচিয়ে রাখার অক্লান্ত প্রচেষ্টা।

রেজাঃ আপনার মূল্যবান সময় ও মতামত প্রদান করার জন্য নতুনদিনের পক্ষে গভীর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। আপনার সুস্বাস্থ্য ও সুসমৃদ্ধি কামনা রইল।

ফারজানা করিম: নতুনদিনের সকল প্রিয় কুলাকুশি এবং আমার পাঠকদের প্রতি জানাই আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও অগাধ ভালোবাসা। আপনাদের স্নেহ ও উৎসাহ ছাড়া আমার সাহিত্যচর্চা কখনো পূর্ণতা পেত না।

বিশেষ ধন্যবাদ রেজা ভাই আপনাকে,আপনার সঙ্গে কাটানো সময় সত্যিই অনবদ্য। আপনার আন্তরিক সমর্থন আমার হৃদয়ে অনন্য প্রেরণার স্পন্দন জাগিয়েছে। আপনাদের অনেক ভালোবাসা ও সমর্থন পেয়েছি,এটা অনেক বড় অর্জন।

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Close