✍️ শামসুল তালুকদার।
একটি শিশুর জীবনের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার কখনোই অর্থ নয়। তার সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হলো চরিত্র, শিক্ষা, মূল্যবোধ, ঈমান, আত্মসম্মান এবং নিজের যোগ্যতায় দাঁড়িয়ে জীবন গড়ে তোলার সাহস। যে সন্তান জীবনের সংগ্রামকে বুঝতে শেখে, পরিশ্রমের মূল্য উপলব্ধি করে এবং হালাল উপায়ে সফল হওয়ার শিক্ষা পায়, সে যেকোনো পরিস্থিতিতে নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই নির্মাণ করতে পারে। কিন্তু যে সন্তান জন্ম থেকেই সবকিছু প্রস্তুত অবস্থায় পেয়ে যায়, তার অনেকের মধ্যেই সংগ্রামের মানসিকতা, দায়িত্ববোধ এবং অর্জনের আনন্দ ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকে।
আজ আমরা সন্তানকে সময় দেওয়ার পরিবর্তে সম্পদ দেওয়াকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। অথচ সন্তান তার বাবার ব্যাংক হিসাবের চেয়ে বাবার পাশে বসে কাটানো সময়কে বেশি মনে রাখে। সন্তানের কাছে সবচেয়ে মূল্যবান হলো মায়ের স্নেহ, বাবার দিকনির্দেশনা, পরিবারের নৈতিক পরিবেশ এবং জীবনের বাস্তব শিক্ষা। এগুলো অর্থ দিয়ে কেনা যায় না।
অনেক অভিভাবক মনে করেন, সন্তানকে কষ্ট করতে না দেওয়াই ভালোবাসার পরিচয়। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলে। জীবনের প্রতিটি চ্যালেঞ্জ একজন মানুষকে পরিণত করে। ছোট ছোট দায়িত্ব, সীমিত সুযোগ এবং নিজের প্রচেষ্টায় কিছু অর্জনের অভিজ্ঞতা মানুষকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। যে সন্তান নিজের পরিশ্রমে প্রথম আয় করে, সে একটি টাকার মূল্যও উপলব্ধি করতে শেখে। আর যে সবকিছু সহজে পেয়ে যায়, তার কাছে সম্পদের গুরুত্ব অনেক সময় স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়।
এর চেয়েও বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, অঢেল সম্পদ অর্জনের প্রতিযোগিতা অনেক মানুষকে অনৈতিক পথে ঠেলে দিচ্ছে। দুর্নীতি, প্রতারণা, অবৈধ উপার্জন, অসততা এবং সীমাহীন লোভ সমাজে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। কারণ আমরা মনে করছি, সন্তানের জন্য যত বেশি সম্পদ রেখে যেতে পারব, ততই আমরা সফল বাবা-মা। অথচ এই সম্পদের উৎস যদি অশুদ্ধ হয়, তবে তা সন্তানদের জন্য আশীর্বাদের পরিবর্তে অভিশাপও হতে পারে।
ইসলাম এই বিষয়ে অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে। ইসলাম সম্পদ অর্জনকে নিরুৎসাহিত করে না; বরং হালাল উপার্জনকে ইবাদতের মর্যাদা দিয়েছে। কিন্তু সম্পদ যেন কখনো মানুষের উদ্দেশ্য না হয়ে যায়। ইসলাম সন্তানদের জন্য বৈধ উত্তরাধিকার নির্ধারণ করেছে, একই সঙ্গে তাদের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। মহানবী ﷺ আমাদের শিখিয়েছেন, উত্তম চরিত্রই একজন মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ। সন্তানকে নামাজ, সততা, আমানতদারিতা, মানবিকতা, পরিশ্রম এবং আল্লাহভীতির শিক্ষা দেওয়া এমন একটি বিনিয়োগ, যার সুফল দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতেই পাওয়া যায়।
আমাদের সমাজে এখন একটি নতুন চিন্তার সূচনা হওয়া দরকার। সন্তানকে একটি বাড়ি দেওয়ার চেয়ে তাকে এমনভাবে গড়ে তুলুন, যাতে সে নিজের যোগ্যতায় দশটি বাড়ি নির্মাণ করতে পারে। ব্যাংকে লাখ লাখ টাকা রেখে যাওয়ার চেয়ে তাকে এমন শিক্ষা দিন, যাতে সে সততার সঙ্গে জীবনে অগণিত সম্পদ অর্জনের সামর্থ্য লাভ করে। শত ভরি স্বর্ণ দেওয়ার পরিবর্তে তাকে এমন আত্মমর্যাদা দিন, যাতে সে সম্মান ও যোগ্যতার মাধ্যমে নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই গড়ে নিতে পারে।
এর জন্য পরিবারের পরিবেশ বদলাতে হবে। সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটাতে হবে। তাদের প্রশ্ন শুনতে হবে। ধর্মীয় শিক্ষা, নৈতিক শিক্ষা, বই পড়ার অভ্যাস, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং মানুষের প্রতি সহমর্মিতা ছোটবেলা থেকেই গড়ে তুলতে হবে। বাবা-মায়ের জীবনই সন্তানের প্রথম বিদ্যালয়। তারা যা দেখে, তাই শেখে। তাই কথার চেয়ে কাজের মাধ্যমে মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করাই সবচেয়ে কার্যকর শিক্ষা।
একজন সফল পিতা বা মাতা সেই নন, যিনি মৃত্যুর পর সন্তানকে কোটি টাকার সম্পদ দিয়ে যান। প্রকৃত সফল সেই অভিভাবক, যিনি এমন একজন মানুষ গড়ে যান, যার সততা বিক্রি হয় না, যার বিবেক ঘুমিয়ে পড়ে না, যে পরিশ্রমকে সম্মান করে, অন্যের অধিকার রক্ষা করে এবং সমাজের জন্য কল্যাণকর ভূমিকা পালন করে।
আজ আমাদের থেমে ভাবার সময় এসেছে। আমরা কি শুধু সম্পদ জমা করছি, নাকি মানুষ গড়ছি? আমরা কি সন্তানকে ভোগের সংস্কৃতি শিখাচ্ছি, নাকি দায়িত্বের শিক্ষা দিচ্ছি? আমরা কি তাদের নির্ভরশীল করে তুলছি, নাকি আত্মনির্ভরশীল হওয়ার শক্তি দিচ্ছি?
যদি আমরা আগামী প্রজন্মকে একটি সুন্দর, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ উপহার দিতে চাই, তবে আমাদের অশুদ্ধ সম্পদ আহরণের প্রতিযোগিতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সন্তানকে সম্পদ দিয়ে নয়, মূল্যবোধ দিয়ে সমৃদ্ধ করতে হবে। তাদের হাতে শুধু উত্তরাধিকার নয়, আদর্শ তুলে দিতে হবে। কারণ সম্পদ একদিন শেষ হয়ে যেতে পারে, কিন্তু সৎ চরিত্র, সুশিক্ষা, ঈমান, পরিশ্রম এবং মানবিক মূল্যবোধ এমন এক সম্পদ, যা একজন মানুষকে সারাজীবন পথ দেখায় এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম আলোকিত করে।
সময়ের দাবি একটাই—সন্তানের জন্য সম্পদ রেখে যাওয়ার আগে, সন্তানকে এমন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলুন, যে নিজেই সততা, যোগ্যতা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারে। সেই দিনই আমাদের পরিবার শক্তিশালী হবে, সমাজে অশুদ্ধ সম্পদের প্রতিযোগিতা কমবে এবং ইসলামী ও মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে একটি ন্যায়ভিত্তিক, মর্যাদাপূর্ণ ও সুন্দর সমাজ গড়ে উঠবে।




















