কলাম

একাত্তরের স্মৃতি

আমি তখন সাত বছরের। কিইবা বুঝি, কিন্তু এতটুকু বুঝতাম দেশটা এক কিন্তু দুই ভাষার অমিলে অন্যরকম ব্যবধান দুই ভাষাভাষীর মধ্যে। পথে নৌকার মিছিল, বেরিয়ে পরতাম তার পেছনে। হারাবার ভয় ছিলোনা, তখন ঢাকার নবাবগঞ্জ এখনকার মত চক্রময় ছিলোনা। মানুষ ছিলো কম, সবাই সবাইকে চিনতো। আর আমার বাল্যকালের গানের পরিচিতি আশেপাশের আত্মীয়, অনাত্মীয়ের মাঝে একটু ছিলোই।

যুদ্ধটা খুব কাছ থেকে দেখেছি। মার্চের থেকে এপ্রিল পর্যন্ত নানাবাড়ি ও দাদাবাড়ি শঙ্কায় কাটিয়েছি। নানা ভুল বলছিনা। এখনো স্পষ্ট মনে আছে মিলিটারি আমগ্রাম ব্রিজের উপর গাড়ি থামিয়েছে। ফুফাতো ভাই কামরুক, বড়ভাই মজনু, আরো কয়েকজন সি এন বি রোডের পাশের নতুন বর্ষার পানিতে সাঁতার কাটছি। আরো একটি মিলিটারির গাড়ি ঠিক পঞ্চাশ মিটার দুরে সেই সি এন বি রোডের উপর দিয়ে আগেই পৌঁছে যাওয়া বাকি গাড়ির অভিমুখে ছুটছে।

গাড়িতে অস্ত্র তাক করা ছিলো। তাই নাবুঝে নয় বুঝেই স্রোতের ঘোলা পানিতে আমরা সবাই ডুব দিয়ে ছিলাম। কতক্ষন আর ডুবে থাকা যায়! বাধ্য হয়ে মাথা তুলতেই দেখি পঞ্চাশ মিটার দুর থেকে যাওয়া শেষ গাড়িটিও পৌঁছে গেছে আমগ্রাম ব্রিজে। সারিবদ্ধভাবে পাক মিলিটারি খালের বামপার ধরে নেমে যাচ্ছিলো। সি এন বি রোড ফাঁকা, আমি, বড়ভাই, কামরুক ভাই সহ আর সব ভাইয়েরা দৌড় পানি থেকে উঠে সোজা কেউ নানা বাড়ির দিকে কেউ দাদার বাড়ির দিকে।

আমি আর বড়ভাই নানা বাড়িতে পৌঁছেই মাকে খুঁজছিলাম খবরটি জানাতে। শেষে জানলাম মা আগেই টের পেয়ে খাল, বিল উপেক্ষা করে ছুট দিয়েছেন আমগ্রাম অভিমুখে। নানার আমগ্রামের বাড়িতে তখন নানার সব নাতনি, মেঝোমামার নতুন বউ। বড়মামীসহ সব খালারা বিয়ে পরবর্তী সকল আনন্দ জলাঞ্জলি দিয়ে ভয়ে শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে, কিন্তু যেনো একটু নিরাপদ। হায় পাক বাহিনীর দোসর,”তোরাই চিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলি সেই হিন্দু অধ্যুষিত গ্রামটিতে নিঃশেষ করে দিতে”! তোরা সফলও হয়েছিলি। পুড়িয়ে দিয়েছিলি পুরো গ্রাম! ভাগ্যটা ভালো ছিলো গ্রামবাসী সহ কাসেম মিঞার পরিবারের। কিভাবে যেনো নানা সংবাদ পেয়ে গ্রামবাসীকে গ্রাম ছাড়বার জন্য সুযোগটা পেয়ে গিয়েছিলেন। সাথে বাড়ির সমস্ত বউঝিয়েদের মিলিটারিদের আসবার পথকে উপেক্ষা ভিন্নপথে পাঠিয়ে দিতে সমর্থ হয়েছিলেন আমার নানা কাসেম মিঞা। মাকে দেখেই নানা সাথে সাথে সাথে ভিন্নপথে পাঠিয়ে দেন যেইপথে তিনি অন্য সবাইকে পাঠিয়ে নিজে বড়ছেলে এবং পত্নীসহ অপেক্ষা করছিলেন মৃত্যুর।

মুহুর্তে একমাত্র দালানবাড়িতে মিলিটারির বহর। চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে তার বড় সন্তান নান্নামিঞা, প্রতিবেশী, আত্মীয়রা মিলিটারির অস্ত্রের মুখের সামনে। অন্যদিকে জ্বালিয়ে দিতে দেরী করেনি সেইদিনের স্বাধীনতা বিরোধী রাজাকাররা তাদের চেনা হিন্দু বাড়িগুলো। নানার শখের বাগান তছনছ করে ঢুকে পরেছে মিলিটারি নিয়ে দালানবাড়িতে। হোলো লুটতরাজ। নানার চেনা প্রতিবেশীরা শুধু সম্মান করে দালানটিকে গুঁড়িয়ে দেয়নি। কারন এই বাড়ির নুন খেয়েই ওদের অনেকের বেড়ে ওঠা। তদুপরি বিচক্ষণ নানার অসাধারণ উর্দূ বলায় ক্যাপ্টেন বুঝে উঠতে পারেনি নানার বাঙালিত্বের পরিচয়টাকে। সারিকরে দাঁড়ানো সবার চোখ বাঁধা। গুলির আদেশের অপেক্ষা। হঠাৎ গোলাগুলির আওয়াজে মিলিটারির বহর ক্যাপ্টেনের আদেশে গুলির শব্দের অভিমুখে ছুটতে শুরু করে এবং ভিন্নপথে আরো কিছু এলোপাথাড়ি বাড়ি জ্বালিয়ে ফিরে যায়। সেখানে জমির মামা, মোখলেস ভাই, আক্তার নানার খালি বাড়িও পুড়িয়ে দিতে সহযোগিতা করে সেইদিনের স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তির চেনা মানুষগুলো।

এরপরও বলতে হবে আমি স্বাধীনতা দেখিনি!! দেখিনি যুদ্ধের ভয়াবহতা মে থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ঠিক পাকিস্তানি মিলিটারি ক্যাম্পের কাছাকাছি থেকেও! বলতে হবে নানা ভাইয়ের ট্রানজিস্টারে প্রতিরাতে স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রের গান, করচা, আরো কতকি আমরা ভাইবোনেরাসহ আমার আব্বা ও মা শুনিনি!!! দেশ সেই একবারই স্বাধীন হয়েছে!! তোমরা যারা জেনে নাজানার ভান করছো,”তোমরা ইতিহাসকে আর কলঙ্কিত কোরোনা”! কারো দোষের ভাগ এইদেশটার উপর চাপিয়ে দিওনা। দেশ ধ্বংস হলে তুমি আমি তোমরা আমরা কেউ এই বিপদ থেকে রেহাই পাবোনা!

ফজলুল বারী বাবু,
০৩ ডিসেম্বর ২০২৪ ইং,
রাত- ২১:৫০ মি:,
লায়ের ভাল্ড, ভিয়েনা।

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Close