কলাম

আলহাজ্জ্ব আহমদ মনোয়ার হুসেইন: লীডসের বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের এক অগ্রগামী স্থপতি

সৈয়দ আনোয়ার রেজা:

আহমদ মনোয়ার হুসেইন, যিনি ছয় দশক ধরে যুক্তরাজ্যের লীডস শহরে বসবাস করছেন, বাংলাদেশি অভিবাসী সমাজের এক অমূল্য সাক্ষী এবং লীডসের বাংলাদেশি সম্প্রদায় গঠনের অন্যতম কাণ্ডারি। তাঁর নাম আজও লীডসের বাংলাদেশি সমাজের ঐতিহাসিক ধারায় উজ্জ্বলভাবে জ্বলজ্বল করছে। প্রবাস জীবনের যে কণ্টকাকীর্ণ পথচলা, সেই পথ ধরে তিনি হয়ে উঠেছেন এক শক্তিশালী সত্তা, যার অবদান বর্তমানেও বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের মেরুদণ্ড হিসেবে অটুট রয়েছে।

আহমদ মনোয়ার হুসেইনের পিতা, মোঃ সরোয়ার মিয়া, ১৯৪৮ সালে লীডসের মাটিতে প্রথম পা রাখেন। এটি ছিল লীডসে বাংলাদেশি অভিবাসনের প্রাথমিক যুগ, যা পরবর্তীকালে একটি শক্তিশালী সম্প্রদায় গঠনের বীজ বপন করে। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটির প্রভাবে আহমদ মনোয়ার হুসেইনও একটি নতুন জীবনের সন্ধানে লীডসে পাড়ি জমান। ১৯৬৪ সালের আগস্ট মাসে, এক উদ্যমী তরুণ আহমদ মনোয়ার, স্বপ্ন ও আশা নিয়ে পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে লীডসে আসেন। যদিও তাঁর সামনে অপেক্ষা করেছিল প্রচণ্ড সংগ্রামের দিন, তবু তাঁর অদম্য মনোবল এবং কর্মদক্ষতা তাঁকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

প্রবাস জীবনের সেই প্রাথমিক দিনগুলো ছিল অত্যন্ত প্রতিকূল ও দুঃসহ। লীডসের তৎকালীন পরিবেশে, একজন বাংলাদেশি অভিবাসী হিসেবে টিকে থাকা এবং নিজের জন্য একটি স্থান প্রতিষ্ঠা করা ছিল এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। কিন্তু আহমদ মনোয়ার হুসেইন সেই চ্যালেঞ্জকে সাহসিকতার সঙ্গে মোকাবিলা করেন। তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম, নেতৃত্বগুণ এবং সম্প্রদায়ের প্রতি অগাধ ভালোবাসা তাঁকে লীডসের বাংলাদেশি অভিবাসী সমাজের অন্যতম পুরোধায় পরিণত করে।

আহমদ মনোয়ার হুসেইনের এই সংগ্রামী অধ্যায় শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্যের কাহিনী নয়; এটি বাংলাদেশের অভিবাসী সমাজের গৌরবময় উত্থানের গল্প। তাঁর নিরলস পরিশ্রম এবং দূরদর্শিতা লীডসের বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গঠনে এবং তাঁদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় এক অনন্য ভূমিকা রেখেছে।

শৈশব ও প্রথম জীবন:

আহমদ মনোয়ার হুসেইনের শৈশব ও কৈশোর সিলেটের মিরাবাজার এলাকায় কেটেছে। সিলেটের এডিএইড স্কুলে দশম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করে, পিতার ডাকে শিক্ষাজীবন অসমাপ্ত রেখেই তিনি লীডসের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। ১১৫ মার্কাম এভিনিউয়ে পরিবারসহ স্থায়ী নিবাস গড়ার পরপরই একটি কঠিন সময়ের মুখোমুখি হতে হয় তাঁকে, যখন তাঁর পিতা আকস্মিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন। এই দুঃখজনক ঘটনাটি পরিবারের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে এবং আহমদ মনোয়ারকে জিসিএসই পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ ছাড়তে বাধ্য করে। ফলে, জীবিকার প্রয়োজনে তিনি West Yorkshire Foundry Factory-তে শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহের এই কঠিন অধ্যায় ছিল তাঁর প্রবাস জীবনের প্রথম সংগ্রাম, যা তাঁকে বিদেশে টিকে থাকার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ করে তোলে।

সমাজ গঠন ও নেতৃত্ব:

শুরুতে তিনি নিজের আর্থিক অবস্থার উন্নতির জন্য কাজ করলেও, অচিরেই তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি সম্প্রসারিত হয়। তিনি লীডসের প্রাথমিক বাংলাদেশি অভিবাসীদের সঙ্গে মেলামেশা করতে শুরু করেন এবং কমিউনিটির সামাজিক ও ধর্মীয় উন্নয়নের প্রয়াসে সক্রিয় হন। সেই সময়ে জুম্মার নামাজের জন্য খুব অল্পসংখ্যক স্থান ছিল, তাই তিনি স্থানীয় বাংলাদেশি অভিবাসীদের সঙ্গে মেলামেশা করতেন জিন্নাহ মসজিদে। লীডসে বাংলাদেশি কমিউনিটির সংখ্যা ক্রমশ বাড়তে থাকায়, একটি স্থায়ী মসজিদ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হতে থাকে। এই অভাব পূরণের লক্ষ্যে আহমদ মনোয়ার হুসেইন এবং মাওলানা লুৎফর রহমানের মতো নেতারা উদ্যোগী হয়ে লীডস শহরের প্রথম বাংলাদেশি মসজিদ প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ শুরু করেন।

আহমদ মনোয়ার হুসেইন শাহজালাল মসজিদ প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক পর্যায়ে প্রথম সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যেখানে তিনি টানা বারো বছর ধরে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর সহকর্মী কুটি মিয়া ছিলেন মসজিদের প্রথম প্রেসিডেন্ট এবং তাঁদের নেতৃত্বে প্রথম ট্রাস্টি বোর্ড গঠিত হয়, যার সদস্য ছিলেন ইয়ানউল্লাহ, কুতুব মিয়া, আব্দুল মতিন, এবং কাজী সাহেব। তাঁদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলে শাহজালাল মসজিদ কেবলমাত্র একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং লীডসের বাংলাদেশি কমিউনিটির সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় পুনর্জাগরণের কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। মসজিদটি কমিউনিটির মিলনকেন্দ্র হয়ে ওঠে, যেখানে বাংলাদেশিরা নিজেদের ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ড নির্বিঘ্নে পালন করতে পারতেন।

নেতৃত্বের অবিচল ধারা:

প্রায় ৮০ বছর বয়সী আহমদ মনোয়ার হুসেইন ২০২২ সাল পর্যন্ত শাহজালাল মসজিদের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য হিসেবে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। তাঁর দৃঢ় নৈতিকতা, সৎ নেতৃত্ব এবং নিরলস পরিশ্রমের কারণে কমিউনিটির মধ্যে তিনি একজন অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। মসজিদটির সম্প্রসারণের জন্য তিনি নতুন পরিকল্পনায় যুক্ত রয়েছেন, যা ভবিষ্যতে লীডসের মুসলিম কমিউনিটির জন্য আরও বৃহত্তর পরিসরে সেবা প্রদান করতে সহায়ক হবে।

তাঁর জীবন এক অনন্য সংগ্রামের আখ্যান, যেখানে তিনি ব্যক্তিগত ও পেশাগত চ্যালেঞ্জকে অতিক্রম করে কমিউনিটির উন্নয়নের জন্য নিজেকে নিবেদিত করেছেন। তাঁর সততা, নিরপেক্ষতা এবং নেতৃত্বের দৃঢ়তা তাঁকে লীডসের বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

এক চিরস্থায়ী নাম:

আহমদ মনোয়ার হুসেইনের এই অসামান্য অবদান লীডসের বাংলাদেশি সমাজের ইতিহাসে এক চিরস্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে। তাঁর নাম বাংলাদেশি কমিউনিটির অগ্রযাত্রার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত, এবং তাঁর কর্মজীবন ও আদর্শ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। সততা, নীতিবোধ এবং নিষ্ঠার মিশ্রণে তিনি শুধুমাত্র একজন সফল নেতা নন, বরং এক অনুকরণীয় আদর্শ, যিনি লীডসের বাংলাদেশি সমাজ গঠনে একটি অপরিহার্য ভূমিকা পালন করেছেন।

এই সংগ্রামী জীবন এবং এর সাফল্যের কাহিনি শুধু লীডসের বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য নয়, বরং সমস্ত অভিবাসী সমাজের জন্য এক মূল্যবান দৃষ্টান্ত। তাঁর নেতৃত্বে গঠিত সমাজ এবং তাঁর রেখে যাওয়া স্থাপত্য নিঃসন্দেহে ভবিষ্যতের বাংলাদেশি প্রজন্মের জন্য প্রেরণা হয়ে থাকবে।

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Close