বিনোদন

স্বপ্ন দর্পণ

প্রথম থেকে ষষ্ঠ পর্বের লিংক

স্বপ্ন দর্পণ

 

 

সাত

চৈতী:
আরে বাইব্বা, তুমি?? এই সুকুমার, বজ্জাত এদিকে আয়, আমার সাথে নাটকীয়তা!

চৈতীর হাক শুনে ড্রয়িংরুম থেকে সুকুমার ছুটে আসে। পেছনে পেছনে শ্রাবন্তী।

সুকুমার:
আরে মামু, তুই কখন আইলি?

চৈতী বাবুকে এবং তার সাথে আসা অতিথিদের ঘরে ঢুকতে করিডোরে জায়গা করে দেয়। বাবু, মনিকা পারভেজ ভেতরে প্রবেশ করে। মনিকা পারভেজ পায়ের জুতা খুলে বাইরে রাখতে চাইলে চৈতী বারণ করে এবং করিডোরে জুতা রাখবার জায়গা দেখিয়ে দিলে সবাই সেখানে যার যার জুতা রেখে ভেতরে প্রবেশ করে। চৈতী ড্রইংরুমে ঢুকতে ঢুকতে সুকুমারের কান মলে দেয়!

চৈতী: (কাঁদতে কাঁদতে) আমার জীবনের কতবড় প্রাপ্তি তোরা, জানিস? আমি মরে যাই আবার বারবার তোদের এই ভালবাসার কারনে বেঁচে উঠি।

অতুলের মিষ্টি ডাকে চৈতী ফিরে আসে স্মৃতির জানালাটাকে বন্ধ করে!

অতুল:
পিসিমনি!! এইযে তোমার অতুল বাবুই!

ইমিগ্রেশন পার হয়ে যে অটোমেটিক দরজা বাইরে বের হবার সেই দরজা খোলা পেয়েই সবার অলখে অতুল ছুটে আসে বাইরে। চৈতী নিজেও কখন একেবারেই সেই দরজার কাছে এগিয়ে ফুল মাটিতে রেখে অতুলকে কোলে তুলে নেয় বুঝতেই পারেনা। ভুলেই যায় চৈতীর পিঠের এবং কোমরের ব্যথার কথা! ভুলে যায় তার জীবনে জাগতিক কতটা অসন্তোষ, অবজ্ঞা, অবহেলা, কষ্ট! সব, সব যেনো মুহূর্তের জন্য উধাও। রাতুল আর মৃদুলা মায়ের আবেগ অনুভূতির পরম সাক্ষী। তারাও পরক্ষণে ছুটে যায় মায়ের কাছে। মৃদুলা তুলে নেয় মায়ের মাটিতে লুটানো ফুলের তোড়া।

সুকুমার, শ্রাবন্তী লাগেজ নিয়ে এগিয়ে আসছিলো বের হবার জন্য। এরমধ্যে অতুল কখন তাদেরকে পিছনে ফেলে বাইরে চলে গেছে টের পায়নি। বের হবার দরজার কিছুটা কাছে এসে সুকুমার খেয়াল করে অতুল সাথে নেই! দাঁড়িয়ে পরে সুকুমার! শ্রাবন্তী সুকুমারকে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পরতে দেখে নিজেও দাঁড়িয়ে পরে এবং লক্ষ্য করে অতুল নেই। স্বামী স্ত্রী দুজন দুজনের দিকে তাকায়।

শ্রাবন্তী:
এই অতুল কই?

সুকুমার:
অমিওতো তাই জানতে চাইছি।

সুকুমারের অস্থিরতা বেড়ে যায়। সে উচ্চস্বরে ডাকতে থাকে,”অতুল, অতুল”! আশেপাশে সবাই সুকুমারের অতুল অতুল ডাকে ফিরে তাকায় তার দিকে। শ্রাবন্তী হাতের লাগেজ ছেড়ে দৌড়ে যেতে থাকে লাগেজ বেল্টের পানে। এয়ারপোর্ট সিকিউরিটি পুলিশ সুকুমার ও স্রাবন্তীর অস্থিরতা দেখে এগিয়ে এসে জানতে চায় তাদের অস্থিরতার কারণ। পুলিশ সাথে সাথে সুকুমারকে আসস্থ করে তারা তার সন্তানকে খুঁজে দেবে। পুলিশ ওয়্যারলেস করে দেয় ইনফরমেশন ডেস্কে। সাথে সাথে লাউড স্পিকারে ঘোষণা দিতে থাকে এক কোকিল কণ্ঠী। রাতুল প্রথম বুঝতে পারেনি। সে অবাক হয়ে মাকে শুনতে বলে ঘোষণাটি। সেতো মায়ের সাথেই আছে তবে তার হারিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিচ্ছে কেনো!

চৈতী রাতুলের কথায় চমকে ওঠে! আরে এতো অতুলের নাম ঘোষণা করেছে। রাতুল মায়ের কথা শুনে বুঝে ফেলে কি ঘটেছে।

রাতুল:
মা জলদি কাকুকে ফোন করো।

চৈতীর হাতেই ছিলো ফোন। অতুলকে মৃদুলার হাতে ধরিয়ে বোমাইলে সুকুমারকে ফোন ঘোরায়!

চৈতী:
সুক্কু ফোন ধর। হ্যালো, হ্যালো সুক্কু অতুল আমার সাথে। তোরা চিন্তা করিসনা!

সুকুমারের বুঝতে বাকী রইলোনা। সাপের ভয়ে ভীত হলে কি হবে। দুরন্তপনায় তার সন্তান তার চাইতে কম নয়। শ্রাবন্তী দৌড়ে আসছে লাগেজ বেল্ট ঘুড়ে।

সুকুমার:
অতুলকে পাওয়া গেছে! সে অলরেডি তার পিসির কাছে পৌঁছে গেছে।

সিকিউরিটি পুলিশ দুজনের মুখে প্রসন্নতার আলো দেখতে পেয়ে জানতে চায় অতুলকে পাওয়া গেছে কিনা। সুকুমার বিনয়ের সাথে সবটা ঘটনা বর্ণনা করে তাদেরকে ধন্যবাদ জানালে পুলিশ পুনরায় ইনফরমেশন ডেস্কে ইনফর্ম করে। সাথে সাথে অতুলকে পাওয়ার ঘোষণা বেজে উঠে লাউড স্পিকারে। অতঃপর সুকুমারেকে সিকিউরিটি পুলিশ একটু ফর্মালিটির জন্য ইনফেকশন ডেস্কে নিয়ে যায়, স্রাবন্তী ছুটে চলে সেই দরজা অভিমুখে, যে দরজার ওপারে তার অস্থিরতা নিরসনের চাবিকাঠি দাঁড়িয়ে আছে তার অপেক্ষায়!

সন্তানের জন্য পিতামাতার উৎকণ্ঠার সাথে পৃথিবীর অন্য কোনোকিছুর উৎকণ্ঠার তুলনা চলেনা। একটি সন্তানের জন্য পিতামাতা তার ভুমিষ্ট হবার আগে থেকেই একের পর এক পরিকল্পনা করা শুরু করে। এই পরিকল্পনা ক্ষেত্রবিশেষে ভিন্নতর হয়ে থাকে। যারা ধন সম্পদে ধনী তাদের পরিকল্পনা হয় এক, আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকা মধ্যবিত্তের পরিকল্পনা হয় আরেক। নিঃস্ব মানুষগুলো প্রতিটি দিন কিভাবে কাটবে সন্তানটিকে নিয়ে সেই চিন্তায় অস্থির হলেও প্রত্যেক বাবা মা তার সন্তানকে চায় মানুষের মত মানুষ করতে। সন্তানের সামান্য অসুস্থতা কিংবা কোনো বিপদ পিতা মাতাকে করে বিচলিত সে যে গোত্রের পিতা মাতাই হোকনা কেনো!

স্বপ্ন দর্পণ

আট

কিছু সম্পর্ক এতটাই আত্মিক যে, রক্তের সাথে তার কোনো যোগসূত্র না থাকলেও রক্তের চাইতে অনেক অনেক বেশী গুরুত্বের, তার প্রমান অতুলের সাথে চৈতীর সম্পর্ক। একটু পিছনের দিকে ফিরে তাকালে সাত সদস্যের “হানাদলের” একে অন্যের সাথে প্রেম, ভালবাসা, আত্মীয়তা সবটাই রক্তের চেয়ে অনেকবেশী আপন বলার অপেক্ষা রাখেনা।

বুলার বাবা শিমুলগঞ্জের একজন সাদামাটা ব্যাবসায়ী। দুটো দোকানের একটিতে নিজে বসে, আরেকটিতে আপন ফুপাতো ভাই শফিককে দিয়েছে দেখাশোনা করতে। কিন্তু সবকিছুর দেখভাল বুলার বাবা আরিফ শেখ নিজেই করেন। দুটো দোকানের ধরণ যেহেতু দুই প্রকারের তাই, আরিফকেই দিতে পারতেন সবটা দায়িত্ব। সরল মানুষের এই ধরণের প্রবণতাই তাদের চরিত্রের মূল বৈশিষ্ট্য। কিন্তু তিনি তা করেননি। এর পেছনে বুলার মায়ের ইচ্ছাকে গুরুত্ব দেয়াটাই ছিলো মুখ্য কারন।

যে দোকানটা আরিফ শেখ নিজে চালায় সেটি মনোহরী। শফিক চালায় একটি কাপড়ের দোকান। দুটি দোকানই আরিফ শেখের সততার কারণে শিমুল গঞ্জের সেরা দোকান। দুরের গ্রাম থেকে আসা মানুষগুলো সদায়পাতির জন্য প্রথমেই আরিফ শেখের দোকানে আসে। আবার কোনো নতুন খরিদ্দার হয়তো কারো মুখে আরিফ শেখের এবং তার দোকানের প্রশংসা শুনেছে অথচ জানেনা দোকানের অবস্থান। তখন সেই খরিদ্দার আরিফ শেখের “বুলা সুপার ষ্টোর” খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত কোনো মনোহরী সদায় করবেইনা।

হানাদলের অবাধ বিচরণ ছিলো আরিফ শেখের মনোহরী দোকানে সপ্তাহে অন্তত দুইবার। চৈতীর নেতৃত্বে সপ্তাহে এই দুইদিন আরিফ শেখ কতটা আনন্দ পেতো তার আপ্যায়ন দেখেই বোঝা যেতো। আরেকটি বিষয়ে না বললেই নয়। হয়তো কোনো আবদার বুলার কাছ থেকে উঠেছে, আরিফ শেখ মেয়ের দিকে মনোযোগ দেয়ার পরক্ষনেই চৈতীর মুখের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করতো চৈতীর মনোনয়নের। বুলা ঠিক বাবার মতই সরল মনোভাবাপন্ন এবং বন্ধুপ্রীতিতে এতটাই উঁচুমনের যে, বাবার এই বিষয়টাকে সে অতন্ত্য ভালবাসার অবিরে রাঙিয়ে জড়িয়ে ধরতো আপন হৃদয়াঙ্গনে!

শীতের ছুটিতে হানাদলের বনভোজন হোতো কয়েকদফায়। তারমধ্যে আবার একটি হতো লতায় পাতায় মেশানো সব বন্ধুদের সম্মেলনে। এই বনভোজনের সমস্ত চাল, তেল, নুন, গরম মসলা, আরো যাকিছু দরকার আরিফ শেখের বুলা সুপার ষ্টোর। এই ক্ষেত্রে হানাদল অবশ্য দায়ী নয় কোনোভাবেই। আরিফ শেখের স্নেহই এই ক্ষেত্রে হানাদলকে প্রতিনিয়ত ঋণী করে চলেছে।

এই বছর হানাদল শুধু একটাই বনভোজন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বুলা:
আব্বা জানতে চাইছিলো এবার বনভোজন করছিনা কেনো?

তুলসী:
কাকুর আদরের তুলনা নাইরে। কই আমরা যামু তার কাছে, না সে নিজেই অস্থির আমরা বনভোজন করমু কিনা খবর জানতে চাইছে!

বাবু:
ঠিক কথা দাদা। এইযে প্রতি বছর বিশ পঁচিশ জনের দুই তিনবার চাইল তেলের যোগান দেয়া, সত্যি এর তুলনা হয়না!

সুকুমার:
বুলা এইজন্য দায়ী!

আসমা;
এইডা কি কইলি? এইজন্য বুলা দায়ী কেন?

চৈতী:
ঠিকইতো! এইকথা কেন কইলিরে সুক্কু?

সুকুমার:
ভুল কিছু কইনাই। বুলা আমগোর দলের না হইলে কি কাকায় এই উপহার সামগ্রী দিতো প্রতি বছর?

সবাই একসাথে হাসতে থাকে। এই হাসির মধ্যে কিযে অন্তরিকতা উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর তার কোনো বর্ণনা আসলেই লাগেনা।

তুলসী:
কিরে বুলবুলের কি হইলো, আজ ওর আসতে এতো দেরী হইতেছে কেন? কেউ কি জানিস কিছু?

বাবু:
বুলবুল আজকাল লাইব্রেরীতে সময় কাটায়। কি একটা ম্যাগাজিন নিয়া ব্যস্ত!

চৈতী:
সেতো বুঝলাম, সেই কাজে আমরাও সাথ দিছি। আর আইজ তাই নিয়া কথা হইবো সে নিজেই গতকাল কইলো। কিছু সমস্যা হইলো নাকি?

বুলা:
এক কাজ করলে কেমন হয়, আমরা চল বুলবুলের বাসায় যাই। অনেকদিন রাবেয়া খালার গল্প শুনিনা।

আসমা:
ঠিক কথা কইছে বুলা। চল একটু ঘুইড়া আসি বুলবুলের বাড়ির থিকা !

চৈতী:
তয় আইজ আর বনভোজন নিয়া আমাগোর আলোচনা হইলোনা!

সুকুমার:
আগে চল দেখি বুলবুইল্যার কি খবর। দরকার হইলে ওর ঘরে বইসা আমরা আলোচনা করুম।

তুলসী:
এক্কেরে খাঁটি কইছে সুক্কু মিয়া। আর এই সময়ে রাবেয়া খালার হাতের রান্নাও খাওন যাইবো অনেকদিন পর!

আসমা:
হায়রে রাক্ষস, তোর স্বাস্থ্য দেইখ্যা কেউ কইবো তুই এমন খাওন পাগলা!!

আরেকবার সবাই প্রাণখুলে হেসে উঠলো। যেনো আকাশের উদারতা সেই হাসিতে যোগ দিয়ে হাসতে লাগলো আরোবেশী উচ্ছাস নিয়ে সবার অলক্ষ্যে!

চলবে………

ফাজলুল বারী বাবু,
৯ জানুয়ারী ২০২২ ইং,
সকাল, ইলফোর্ড, লন্ডন!

স্বপ্ন দর্পণ

নয়

সুকুমার বের হয়ে আসছে সেই অটোমেটিক দরজা পিছনে ফেলে, যে দরজা দিয়ে একটু আগে এক পাগলা বেটা তার পিসির ভালবাসার টানে পিতামাতাকে ভুলেই বের হয়ে এসেছে এক ঘোরের মধ্য দিয়ে। অতুল মায়ের হাত ছাড়িয়ে আবার ছুটে গেলো বাবার কাছে। একলাফে সে সুকুমারের কোলে স্ট্রাইকারের কিক খাওয়া বলের মত উঠেই বুকে মুখ গুঁজে কাঁদতে লাগলো। কোথায় সুকুমার ভাবছিলো ছেলেকে একটু বকে দেবে, সেখানে ছেলের এমন কাঁন্নায় সে নিজেই চোখের পানিতে চোখ ভাসিয়ে ফেলতে লাগলো। ভাগ্য ভালো চোখে সুকুমারের চশমা। নইলে এই মুহূর্তে এই বুড়ো খোকার বয়ে যাওয়া অশ্রুর বান দেখে অনেকেই আপ্লুত হতে পারতো! কতক্ষণ বাপছেলে এভাবে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলো তারা বুঝতেই পারেনি!

চৈতী:
সরি বন্ধু, আমার কারনে কি একটা ঘটনা ঘটে গেলো আজ!

শ্রাবন্তী:
কি বলো এইসব? অতুলের এই পাওয়া ওর জন্য কতবড় আশীর্বাদ তুমি জানো??

সুকুমার অতুলকে চৈতীর কোলে দিয়ে রাতুল আর মৃদুলাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো! রাতুল মৃদুলা সুক্কু কাকুর শক্ত বাহুর আড়ালে খুঁজে পেতে উদগ্রীব হয়ে উঠলো পিতার স্নেহ, ভালবাসা! যে পিতা আজ দীর্ঘ ছয় সাত বছর একটিবারের জন্য একটা ফোন দিয়ে খোজঁ নেয়নি!

চৈতী:
ঐ এখানে আজকেই এভাবে সব চোখের অশ্রু শেষ করে ফেললে যাবার দিন কি হবে!!!

সুকুমার:
যাবার আগে কিছু অশ্রু কিনে ফিলাপ করে নেবো! তোর গাছ বাগানে পাওয়া যাবেনা???

চৈতী:
আমার গাছ বাগানে এইসব ফালতু জিনিস বিক্রি হয়না!

মৃদুলা:
তোমার গাছ বাগানে বারুদ বিক্রি হয় কি বলো??

রাতুল:
দিদি তুই মাকে কি বলচিস? তোর স্কুল ব্যাগ, পয়সার ব্যাগ, তোর টেবিল, ড্রয়ার কোথায় বারুদ নেই বলতে পারবি?

মৃদুলা:
একটা কষে চড় খাবি! আমি কি আম্মুর মত বারুদ মার্কা নাকি??

চৈতী:
দেখলি সুক্কু, এই মাইয়্যা আমি জনম দিছি! আমারে কয় বারুদ মার্কা!!!

এবার আর না হেসে পারলোনা কেউ চৈতীর মুখের ভাবভঙ্গি দেখে!

সুকুমার:
আমি কিছুই জানিনা, চৈতীর সাথে আমার পরিচয়ই নাই, না, কোনোদিন ছিলোও না!

চৈতী:
আচ্ছা, কয়দিন আছসনা? তোর ঘাড়ে কয়টা মাথা এইবার ছিল্যা কাইট্টা বুঝাই দিমু।

আবার সবাই হাসতে শুরু করলো, কিন্ত মৃদুলা একটু চুপসে গ্যাছে! কি করে এমন একটি শব্দ সে মাকে নিয়ে ব্যবহার করতে পারলো। বাবা নামের সেই লোকটি শুধুকি মাকে অবহেলা করেছে, তাদের পাওনা আদর, ভালবাসা এমনকি শাসনটুকুও সে দেয়নি কিছুটা সময়ের জন্যেও! সারাক্ষণ ফোন, ল্যাপটপ আর বাইরে বাইরে থেকেছে। কাজের নামে আরেক প্রভিন্সে গিয়ে থেকেছে! ভাবতে ভাবতে মৃদুলা ডুকরে কেঁদে উঠলো! সুকুমার তখনও রাতুল মৃদুলাকে হাতে ধরে ছিলো। মৃদুলার কাঁন্না তার কিশোরী দেহে এক অদৃশ্য ঢেউ তুলতেই সুকুমার ফিরে তাকালো মৃদুলার দিকে!

সুকুমার:
কিরে মা, তুই কাঁদছিস কেনো??

বলে সুকুমার নিজেই মেয়েটাকে বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো নীরবে! মৃদুলার সমস্ত চরাচর শুন্য হয়ে গেলো নিমেষে। কোন খেয়াল নেই কোথায় তার অবস্থান এই মুহূর্তে। শুধু মনে হতে লাগলো এক পরম নির্ভরতার চাদর তার কোমল দেহে জড়িয়ে আছে। শ্রাবন্তী, চৈতী একটু সামনে এগিয়ে গিয়েছিলো। রাতুলের ডাকে থমকে দাঁড়িয়ে দেখলো “পিতৃস্নেহে”র অপরূপ এক দৃশ্য! আশেপাশের সবাই ব্যস্ত চলে যাওয়ার মাঝেও একবার দৃশ্যটি না দেখে পারলোনা। শ্রাবন্তী এগিয়ে আসতে পেছনে পেছনে অরু এসে দাঁড়ালো সুকুমার ও মৃদুলার একেবারে কাছে। সুকুমার মেয়েকে ছেড়ে মাথায় হাত বোলাতে লাগলো! চৈতী হাটুগেড়ে বসে মেয়ের করুণ মুখের দিকে তাকাতেই মৃদুলা ঝড়ের বেগে মাকে জড়িয়ে ধরে অপ্রকৃতিস্থ হয়ে বলতে লাগলো,

মৃদুলা:
মা আমায় মাফ করে দাও। তোমার মত এমন আত্মত্যাগী মাকে নিয়ে আমি যে বিদ্রূপ করেছি, তার জন্য আমায় শাস্তি দাও। আমাকে তুমি একটুও ক্ষমা কোরোনা!

চৈতীর চোখে বহু বছর পরে অশ্রুর বন্যা বইতে লাগলো। মুখে কথা আসছেনা, শুধুই কাঁদতে ইচ্ছে করছে। রাতুল, অতুল দুজনেই চৈতী ও মৃদুলাকে জড়িয়ে ধরে আছে, যেন এই দুই দুঃখির দুঃখ বাইরের কেউ না দেখতে পারে তারই জন্য দুজনের সম্মিলিত বেড়ি!

চলবে…….

স্বপ্ন দর্পণ

ফজলুল বারী বাবু,
লন্ডন, যুক্তরাজ্য।

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Close