আন্তর্জাতিক
বিশ্ব মানবের ভালাবাসায় সিক্ত হয়ে চির নিদ্রায় সমাহিত হলেন রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ

ব্রিটিশ রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন।
ব্রিটেনসহ বিশ্ব মানবের ভালাবাসায় সিক্ত হয়ে, রিক্ত হস্তে চির নিদ্রায় সমাহিত হলেন রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ। গোটা ব্রিটেনবাসী এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অন্তত শত রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের উপস্থিতিতে আজ ১৯শে সেপ্টেম্বর অত্যন্ত ভাবগম্ভীর পরিবেশে, সারাদিনব্যাপী নজিরবিহীন রাজকীয় শেষকৃত্যানুষ্ঠানের পর, এক ঘরোয়া অনুষ্ঠানের মাধ্যমে উইন্ডসরের সেইন্ট জর্জেস চ্যাপেলের কাছে তার স্বামী ডিউক অব এডিনবরা, তাঁর বাবা রাজা ষষ্ঠ জর্জ, তার মা রানী এলিজাবেথ এবং বোন রাজকুমারী মার্গারেটের সমাধি বরাবর সমাহিত করা হয়।
রানী মেরি থেকে বর্তমানের দ্বিতীয় এলিজাবেথ, শাসক হিসেবে তারা কেমন?
রানীর বড় ছেলে এবং উত্তরসূরি রাজা তৃতীয় চার্লস (৭৩) শোক যাত্রায় নেতৃত্ব দেন। তার তিন ভাইবোন এবং তার উত্তরাধিকারী প্রিন্স উইলিয়াম, রাজার ছোট ছেলে হ্যারি তাদের সাথে যোগ দেন। গত রোববার চার্লস বলেছেন, তিনি এবং তার স্ত্রী কুইন কনসর্ট ক্যামিলা সমবেদনা এবং শোক বার্তা পেয়ে ‘গভীরভাবে অভিভূত’। তিনি আরো বলেন, আমরা সবাই আমাদের শেষ বিদায় জানাতে প্রস্তুত। আমি কেবল সকলকে ধন্যবাদ দিতে চাই।
রানীর মৃত্যুর পর রাজ পরিবারের দুই সদস্য রানীর দ্বিতীয় ছেলে প্রিন্স অ্যান্ড্রু এবং চার্লসের ছোট ছেলে প্রিন্স হ্যারি সাময়িকভাবে রাজকীয় আনুষ্ঠানিকতায় ফিরে আসেন। রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাসও ছিলেন, যাকে রানী তার মৃত্যুর মাত্র দুই দিন আগে ১৫তম ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন। ট্রাসের প্রধানমন্ত্রীগণ এবং তাঁর সমকক্ষরা এবং ব্রিটেনের বাইরে ১৪টি কমনওয়েলথ দেশের প্রতিনিধিরা যেখানে যোগ দেন। এছাড়াও মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, জাপানের সম্রাট নারুহিতো, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানসহ দুই হাজারের বেশি মানুষ ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতে যোগ দেন।
রানীর মৃত্যুতে তার ৭০ বছরের রাজত্বকালে ব্রিটেনে তার রাজত্ব এবং অতীতের উত্তরাধিকার, এর বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যতে কী হতে পারে সেইসাথে আজীবন সেবা ও কর্তব্যের মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটেছে। প্রায় ৬ হাজার সামরিক কর্মী এ গৌরবময় রাষ্ট্রীয় অন্তেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নেন। ব্রিটেনের সর্বোচ্চ পদমর্যাদার সামরিক কর্মকর্তা, চিফ অফ ডিফেন্স স্টাফ অ্যাডমিরাল টনি রাদাকিন, এটিকে ‘রানীর জন্য আমাদের শেষ কর্তব্য’ বলে অভিহিত করেন।
প্রথমে রানীর কফিন রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য ওয়েস্টমিনস্টার হল থেকে ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সহস্রাধিক মানুষের উপস্থিতিতে ধর্মীয় প্রার্থনার পর লাশ নেওয়া হয় সমাধির জন্য নির্ধারিত উইন্ডসর ক্যাসেলে। স্থানীয় সময় বেলা ১২টার পর ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবে থেকে শোভাযাত্রা সহকারে কফিনটি ওয়েলিংটন আর্চের উদ্দেশে নেওয়া হয়। রাজা এবং রাজপরিবারের সদস্যরা কফিনের পেছনে শোভাযাত্রায় অংশ নেন। গাড়িতে করে লাশ বহনকারী কফিনটি অনুসরণ করেন কুইন কনসোর্ট ক্যামেলিয়া, উইলিয়াম, হ্যারি, প্রিন্স এডওয়ার্ডের স্ত্রী কেট, মেগান, সোফি। ওয়েলিংটন আর্চ থেকে কফিন উইন্ডসর প্রাসাদে নেওয়া হয়। এসময় শববাহী গাড়ি যাত্রা শুরু করলে রাজকীয় স্যালুটের পাশাপাশি বাজানো হয় জাতীয় সঙ্গীত। গাড়িযোগে উইন্ডসর প্রাসাদে পৌঁছান রাজপরিবারের সদস্যরা। সেখান থেকে কফিনটি উইন্ডসরে নিয়ে যাওয়া হয়। উইন্ডসরে শবযাত্রা শুরু হয় স্থানীয় সময় বিকাল ৩টা ১০ মিনিট থেকে। রাজা ও রাজপরিবারের অন্যান্য সদস্যরা এতে অংশ নেন বিকাল ৩টা ৪০ মিনিটে। তিন মাইল (পাঁচ কিলোমিটার) এলাকাজুড়ে পুরো গমনপথজুড়ে সারিবদ্ধভাবে অবস্থান করবেন সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা। বিগ বেন ঘণ্টাধ্বনি বাজতে থাকে শবযাত্রার পুরো সময় ধরে। রানীর লাশ বহনকারী কফিন ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল পার হওয়ার সময় রাজকীয় স্যালুট দেওয়া হয়। বাকিংহাম প্যালেসের সামনে রাজার রক্ষীরা এই স্যালুট দেন। রানির কফিন নিয়ে শোক মিছিল এটির প্রথম গন্তব্য ওয়েলিংটন আর্চে পৌঁছেছে। সময় লেগেছে প্রায় ৪৫ মিনিট।
হাজার হাজার মানুষ রানির কফিন যে পথ ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তার দুই পাশের রাস্তায় লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। প্রথমে মোটরওয়ে দিয়ে শবযান যাবে বলে পরিকল্পনা থাকলেও পরে এটির রুট পরিবর্তন করা হয়। এটি যাচ্ছে বিভিন্ন এলাকার ভেতর দিয়ে যাওয়া রাস্তা ধরে, অনেক ছোট ছোট শহর কেন্দ্র হয়ে, যাতে আরও বেশি সংখ্যায় মানুষ রানির শবযান দেখার সুযোগ পান। রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় মানুষ ফুল ছুঁড়ে দিয়ে তার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান।



