সফল বাঙালী

সৈয়দ সালেহ আহমেদ: মহাকাব্যিক জীবনযাত্রা ও প্রবাসী সমাজের অগ্রণায়ক

সৈয়দ সালেহ আহমেদ ছিলেন বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন সম্মুখযোদ্ধা এবং প্রবাসে বাংলাদেশি সমাজের অগ্রণায়ক, যিনি ত্যাগ, সাহস ও নেতৃত্বের সমন্বয়ে গড়ে তুলেছেন এক অনন্য জীবনপথ। সুনামগঞ্জের কৃতী এই সন্তান মুক্তিযুদ্ধে যেমন সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন, তেমনি প্রবাসে বাংলাদেশি কমিউনিটির ঐক্যবদ্ধতার ক্ষেত্রে অবিস্মরণীয় ভূমিকা রেখেছেন।

মুক্তিযুদ্ধে সাহসিকতা ও অবদান :

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়, বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য সৈয়দ সালেহ আহমেদের অনন্য ত্যাগ এবং অসাধারণ বীরত্ব আজও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হয়। সুনামগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষারত অবস্থায়, নবম শ্রেণিতেই তিনি স্বাধীনতার সংগ্রামে যুক্ত হন এবং বাঁশখালী ট্রেনিং সেন্টারে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এই প্রশিক্ষণ তাঁকে গেরিলা কৌশলে পারদর্শী করে তোলে, যার মাধ্যমে তিনি সম্মুখযুদ্ধসহ নানা অভিযানে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। তাঁর এই অবদান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে।

জাতিগঠনে তাঁর উদ্যোগ ও অবদান :

স্বাধীনতার অর্জনের পর দেশে ফিরে এসে সৈয়দ সালেহ আহমেদ শিক্ষাক্ষেত্রে জাতিগঠনের গুরুদায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি নিজ গ্রামের সৈয়দপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার মাধ্যমে জাতি গঠনের কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন। বিনা পারিশ্রমিকে শিক্ষকতা শুরু করে নতুন প্রজন্মকে আলোকিত করার প্রচেষ্টা চালান। তাঁর এই অবদান শুধু শিক্ষা ক্ষেত্রেই নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে দেশপ্রেম এবং সচেতনতার মশাল জ্বালাতে অবিস্মরণীয়।

প্রবাস জীবনের সংগ্রাম ও কমিউনিটি নেতৃত্ব ১৯৭৮ সালে জীবিকার তাগিদে সৈয়দ সালেহ আহমেদ প্রবাস জীবনে পা রাখেন। বেলজিয়ামে স্বল্প সময় অবস্থানের পর তিনি হল্যান্ড ও জার্মানি হয়ে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। যুক্তরাজ্যে লীডসে বসতি স্থাপন করে, তিনি দেখেন যে সেখানকার বাংলাদেশি কমিউনিটি ছিল অব্যবস্থাপনার শিকার। স্থানীয় নেতা ইসহাক আলীর সাথে মিলে তিনি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য একটি সুসংগঠিত ও শক্তিশালী কমিউনিটি গঠনের প্রচেষ্টা চালান। তাঁর নিঃস্বার্থ উদ্যোগে লীডসে বাংলাদেশি কমিউনিটি ধীরে ধীরে সংহত হয় এবং সামাজিক উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করে।

প্রবাসে বাংলাদেশি কমিউনিটি স্থাপন ও সংহতকরণ সৈয়দ সালেহ আহমেদের প্রবাসী জীবন শুধুমাত্র প্রবাসে জীবনযাপনেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং তিনি প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির বৃহত্তর স্বার্থে নিজেকে উৎসর্গ করেন। তিনি স্থানীয় বাংলাদেশি মসজিদ ও কমিউনিটি সেন্টারের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং পরবর্তীতে শাহজালাল জামে মসজিদের সভাপতি নির্বাচিত হন। তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বে লীডস বাংলাদেশ সেন্টারও প্রবাসীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে। এই সকল প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি নতুন প্রজন্মের মধ্যে দেশের প্রতি প্রেম ও সংস্কৃতির প্রতি গর্বের বীজ বপন করেন, যা বাংলাদেশি ঐতিহ্যের ভিত্তি আরও সুদৃঢ় করে।

সৈয়দ সালেহ আহমেদের জীবন এক মহাকাব্যিক অধ্যায়, যেখানে দেশপ্রেম, কমিউনিটি গঠন, এবং আত্মোৎসর্গ ছিল অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। তাঁর নিঃস্বার্থ পরিশ্রম এবং অগ্রণায়ক নেতৃত্ব আজও প্রবাসী বাংলাদেশি সমাজের জন্য গর্বের উৎস। তাঁর আত্মত্যাগ, দেশসেবা, এবং সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড এক বিরল প্রজ্ঞার নিদর্শন, যা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে যাবে।

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Close