বাংলাদেশ
প ত নে র এক মাস হয়েছে শেখ হাসিনার : বিশ্লেষণ, পরামর্শ, স্মৃতি-কথা ও প্রত্যাশা

শেখ হাসিনার পতনের মাত্র একমাস হয়েছে। কিন্তু বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নির্বাচনের রূপরেখা ঘোষণার ব্যাপারে তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে চাপ দেওয়া শুরু করেছেন ইতিমধ্যে। এটা বেশ অযৌক্তিক ও দৃষ্টিকটু লাগছে। রাজনৈতিক নেতারা ক্ষমতায় যাবার জন্য তাড়াহুড়ো করছেন বলেই মনে হচ্ছে। তারা কি ভুলে যাচ্ছেন, কোটা বিরোধী রক্তাক্ত আন্দোলন কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন ছিলো না? বরং রাজনীতিবিদদের ব্যর্থতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে জনগণের উপর জগদ্দলের পাথরের মতো চেপে থাকা অবৈধ সরকারের দুঃসহ অত্যাচার ও নৃশংসতা থেকে মুক্তি পেতে কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীদের কোটা বিরোধী আন্দোলনের সাথে একাত্মতা জানিয়ে স্বউদ্যোগে রাস্তায় নেমেছিলেন লক্ষ লক্ষ প্রতিবাদী জনতা? ফসল হিসাবে দীর্ঘ আওয়ামী দুঃশাসনের কবল থেকে মুক্ত হয়েছে দেশটা।
হাজারো প্রাণের বিনিময়ে রক্তাক্ত আন্দোলনের পর মনে হচ্ছে দেশে এখন সুদিন আসবে। ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূস এর প্রধান উপদেষ্টা হওয়া সূশাসন প্রতিষ্ঠায় এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া। তবে বড়ো দেরিতে তিনি দেশের দায়িত্ব নিলেন। ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূস চাইলে আরো আঠারো বছর আগেই বাংলাদেশের সরকার প্রধান হতে পারতেন।
মনে আছে? প্রথম বাংলাদেশী হিসাবে তিনি যখন নোবেল শান্তি পুরস্কার পেলেন, তার গৌরবে গর্বিত হয়ে জাতি নেতৃত্ব আশা করেছিলো তার কাছ থেকে। প্রবল আন্দোলনের মুখে বিএনপি সরকারের পতনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান হওয়ার জন্য ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূস এর নাম ছিলো সর্বাগ্রে। প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিলো তাকে। কিন্তু দায়িত্ব তিনি নিতে চান নি। বিএনপি সরকারের আমলে নিয়োগকৃত বিচারপতিদের ব্যাপারে আওয়ামী লীগের ঘোর আপত্তি থাকায় তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ডক্টর ইয়াজ উদ্দিন আহমেদ নিজে প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করেছিলেন, যা বেশিদিন টিকতে পারেনি দেশজুড়ে প্রতিরোধের কারণে। অতঃপর আঠাশে অক্টোবর লগি বৈঠা নিয়ে আওয়ামী তান্ডবের পর ওয়ান ইলেভেন এ জেনারেল মইন উদ্দিনের প্রযোজনায় ফখর উদ্দিনের প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার মাধ্যমে দেশ তখনকার মতো দেশ রক্ষা পেয়েছিলো এক বিশাল নৈরাজ্য থেকে।
এখন প্রশ্ন হলো, শেখ হাসিনার প্রায় পনেরো বছরের দুঃশাসনের দায়ভার কি শুধু শেখ হাসিনার? নাকি এর জন্য বাংলাদেশের অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তিকেও জবাবদিহিতার মুখোমুখি করা দরকার?
হ্যাঁ, এটা ঠিক যে শেখ হাসিনা সরকারের অত্যাচার নির্যাতনের মূল ঝড়টা গেছে বিএনপি-জামাতের নেতাকর্মীদের উপর দিয়ে। বিরোধী দল সমূহের হাজার হাজার নেতা কর্মী আহত হয়েছেন, জীবন দিয়েছেন, গুম হয়েছেন। তারপরেও শেখ হাসিনার দুঃশাসন থেকে জাতিকে মুক্ত করার মত একটি শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছেন। এছাড়া শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের উপর হামলার ঘটনা কি মানুষ ভুলে যাবে? তখনকার বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের ভাষ্যমতে, প্রায় বিশ লক্ষ মানুষ নেমে ছিলো ঢাকার রাজপথে । কিন্তু সরকারী বাহিনীর নৃশংসতার কারণে এবং বিরোধী দলে সুযোগ্য রাজনৈতিক নেতৃত্বের অভাবে হেফাজতের ভাষ্যমতে প্রায় আড়াই হাজার ছাত্রকে হত্যা করেও শেখ হাসিনা টিকে গেলেন ক্ষমতার মসনদে।
এরপরেও বিরোধী দলের সামনে নানান ইস্যু এসেছে। বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে তার সেনানীবাসের বাড়ি থেকে শেখ হাসিনা এক কাপড়ে বের করে দিয়েছেন, এতিমের টাকা মেরে খাওয়ার মতো স্পর্শকাতর মামলা দিয়েছেন, গ্রেফতার করেছেন। তারপরও সরকার পতনের আন্দোলন গড়ে তুলতে বিএনপি নেতৃবৃন্দ ব্যর্থ হয়েছেন ।
আর জামাতের শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে তাদের ভাষায় ‘মিথ্যা মামলা দিয়ে বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে’ বলে জামাতের পক্ষ থেকে অভিযোগ আছে। সদ্য ধৃত ও বহুল বিতর্কিত বিচারপতি মানিকের দেওয়া মওলানা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর ফাঁসির রায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে প্রায় দুই শতাধিক মানুষ জীবন দিয়েছেন । তারপরেও বিএনপি-জামাত কি বাংলার মানুষকে এই দুঃসহ অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে পেরেছে? না, পারে নাই। তাহলে কোন যুক্তিতে তারা অরাজনৈতিক ছাত্র জনতার রক্তাক্ত ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার সুযোগ নিয়ে ক্ষমতায় যেতে উঠে পড়ে লেগেছেন?
এটা ঠিক যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা চিরকাল থাকবে না। সরকার পরিচালনার দায়িত্ব ঘুরে ফিরে রাজনৈতিক দলের হাতেই আসবে। কিন্তু একটু ধৈর্য ধরতে তো হবে। একটা সুযোগ এসেছে দেশকে ইতিবাচক পরিবর্তনের দিকে ধাবিত করার, দেশের ধ্বংস হয়ে যাওয়া নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার ব্যবস্থা, শিক্ষা ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সহ সব কিছুর সংস্কার করার। দেশের মানুষকে একটা নতুন বাংলাদেশ উপহার দেওয়ার।
ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূস এই গনবিপ্লব পরবর্তী বাংলাদেশের জন্য আশার আলো। বাংলাদেশের স্বাধীনতার অর্ধ শতাব্দী পরেও রাজনৈতিক শাসন মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি আনে নাই, বাক স্বাধীনতা নিশ্চিত করে নাই, দেশের প্রশ্নবিদ্ধ সার্বভৌমত্ব নিরঙ্কুশ করতে পেরেছে কি না, জানা নাই। তাই স্বাভাবিকভাবেই মানুষ রাজনীতি থেকে, রাজনীতিবিদদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।
এখন যখন অপ্রত্যাশিত ভাবে হাজার হাজার কিশোর-তরুণদের জীবনের বিনিময়ে মুক্তি এসেছে, দেশকে সংস্কারের সুযোগ এসেছে এবং সৌভাগ্যক্রমে ডঃ মুহাম্মদ ইউনূসের মতো একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিত্বকে নেতৃত্বের জন্য পাওয়া গেছে, যিনি একই সাথে তার সততা, যোগ্যতা এবং আন্তরিকতার পরিচয় দিচ্ছেন, আমরা তাঁকে কেনো একটু সুযোগ দেই না? ক্ষমতায় আসার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে গেলাম কেনো আমরা?
প্রধান উপদেষ্টা জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে যথার্থই বলেছেন, বিগত পনেরো বছরে দেশের প্রতিটি ব্যবস্থা, প্রতিটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, নির্বাচনী ব্যবস্থা, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, শিক্ষা ব্যবস্থা-সবকিছু ধ্বংস হয়ে গেছে। এই ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশকে টেনে তুলতে হলে অনেক সময়ের প্রয়োজন হবে।
এটা অত্যন্ত আশার কথা যে, যখন ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূস দেশের দায়িত্বভার গ্রহণ করলেন, তখন শোনা গেছে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে প্রায় ছয় বছর দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে এই অন্তবর্তী সরকারকে। আমি মনে করি, প্রয়োজনে এই সময়টাকে প্রলম্বিত করা যেতে পারে। কারণ ডঃ মুহাম্মদ ইউনূসের কোনো রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ নেই। তিনি একজন শিক্ষিত, ভদ্র, মার্জিত ও সম্মানিত মানুষ। জনগণ বিশ্বাস করে, তিনি নিষ্ঠা, সততা এবং আন্তরিকতার সাথে দায়িত্ব পালন করবেন। এটা আশা করাও অযৌক্তিক হবে না, ডঃ মহাথির মোহাম্মদ যেভাবে মালয়েশিয়াকে অতি দ্রুত উন্নতির শিখরে নিয়ে গিয়েছিলেন, যথেষ্ট সময় পেলে ডঃ মুহাম্মদ ইউনুসও ঠিক সেইভাবে বাংলাদেশকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত থেকে একটি উন্নত ও সম্মানিত রাষ্ট্রে পরিণত করতে পারবেন।
ডঃ মুহাম্মদ ইউনূসের আন্তরিকতা, যোগ্যতা এবং কর্মদক্ষতা সম্পর্কে সন্দেহ বা প্রশ্নের কোনো অবকাশ নাই। তবে অনেক আগে তার সাথে সাক্ষাতের ছোট্ট একটা অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয়েছে, বাংলাদেশের জটিল এবং ক্ষেত্র বিশেষে নোংরা রাজনৈতিক মাঠে বিচরণ করতে তার মতো অতি ভদ্র লোকের কিছুটা বাস্তববাদী, ধৈর্য্যশীল এবং কঠোর হওয়ার প্রয়োজন আছে। বিষয়টি একটু খোলাসা করলে বুঝতে সহজ হবে। প্রায় দেড় যুগ আগে ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূস নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর তাকে নিয়ে দেশে-বিদেশে, বিশেষ করে বাংলাদেশের মিডিয়াতে বেশ হইচই পড়ে যায়। যেহেতু বাংলাদেশের প্রথম নোবেল বিজয়ী তিনি, সে জন্য দেশের অতি উৎসাহী সাংবাদিকরা তাকে দেশের সকল রোগের চিকিৎসক মনে করে রাজনীতি, অর্থনীতি সহ সকল বিষয়ে তার মতামত জানতে সময়ে অসময়ে মুখের সামনে মাইক্রোফোন ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি। হয়তো সেই কারণেই একটা পর্যায়ে তিনি রাজনীতিতে নামার চিন্তা করছিলেন যদিও এর কিছুদিন পূর্বে তিনি প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার প্রস্তাব বিনয়ের সাথে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। যাইহোক, রাজনীতিতে আসার সিদ্ধান্তের পর তিনি কয়েক হাজার লোকের কাছে ইমেইল পাঠিয়ে এ ব্যাপারে মতামত চাইলেন! তখনই ভেবেছিলাম, এই ইমেইল রাজনীতি কৃষি প্রধান বাংলাদেশের বাস্তবতার সাথে মিলেনা ! বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ তখন পর্যন্ত ডিজিটাল সেবার আওতায় পড়ে না এবং মানুষ এসব ইমেইল রাজনীতিতে অভ্যস্ত ছিলেন না, তাই স্বাভাবিকভাবেই ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূস আশানুরূপ সাড়া পেলেন না। এজন্য তিনি প্রায় হতাশ হয়ে রাজনৈতিক চিন্তা বাদ দিয়ে দিলেন। ওই সময় তিনি একাধিক বার লন্ডন এসেছিলেন। আমি তখন প্রথম আলোর লন্ডন প্রতিনিধি। তাই চাকরির সুবাদে ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূসের প্রায় অনুষ্ঠানে দাওয়াত পেয়েছি এবং গিয়েছি। তখন সরাসরি তার সাথে সাক্ষাত এবং কথা বলার সুযোগ হয়েছে। এমনই এক অনুষ্ঠানে, সম্ভবত 2007 সালে লন্ডন টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের মেয়র শফিকুল শফিকুল ইসলামের দেওয়া সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ডঃ মুহাম্মদ ইউনূসকে কাছে পেয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘আপনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে হঠাৎ ভাটা পড়ে গেলো কেনো? আপনি কি রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন?’ প্রশ্ন শোনে এক রকম অনুরোধের সুরে তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘প্লিজ, এই বিষয়টা নিয়ে আলাপ না করলে হয়না?’ তখন তার মুখে যে তিক্ত অভিব্যক্তি দেখেছি, তা থেকে বুঝেছি, রাজনীতিতে আসার অভিজ্ঞতা তার জন্য সুখকর হয়নি।
সেই স্মৃতি থেকে বলি, ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূসকে অতিরিক্ত চাপ দেওয়া থেকে বিরত থাকা জরুরি। নয়তো যে গুরুদায়িত্ব তিনি কাঁধে নিয়েছেন, বলা যায় না, অতিরিক্ত চাপ নিতে না পারলে ছেড়েও দিতে পারেন। তবে যেহেতু জাতির প্রয়োজনে তিনি সাড়া দিয়েছেন, সেহেতু আশা করি, তিনি এটা বুঝে শোনেই এসেছেন যে, তাকে অনেক চাপ সহ্য করতে হবে, বিভিন্ন ধরনের ন্যায্য- অন্যায্য দাবি-দাওয়ার মুখে পড়তে হবে।
আমার এই লেখা যদি ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূসের চোখে পড়ে, তবে তার প্রতি অনুরোধ থাকবে, তিনি যেনো তার নীতি ও সিদ্ধান্তে অটল থাকেন, কষ্ট হলেও, সময় লাগলেও, তিনি যেনো তার দেওয়া সকল প্রতিশ্রুতি পূরণ করেন, রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা ব্যবস্থা, সংস্কৃতি, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ও কাঠামো সমূহ, প্রতিরক্ষা ও স্বরাষ্ট্র- সব কিছুতেই যেনো প্রয়োজনীয় সংস্কার করেন।
মাননীয় প্রধান উপদেষ্টাকে আরো বলবো, আপনি সবার কথা শুনলে চলবে না। সবাই নিজ নিজ উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য করবে আপ্রাণ চেষ্টা। কিন্তু আপনি জাতির উদ্দেশ্যে বক্তব্যে যে লক্ষ্য-উদ্দেশ্য তুলে ধরেছেন, সে ব্যাপারে অটল থাকবেন । বাংলাদেশকে সংস্কার করবেন।
বাংলাদেশের প্রতিটি বিভাগে, দেশের রাজনীতি অর্থনীতি সমাজনীতি সংস্কৃতি, বিচার বিভাগ- সব জায়গাতে স্বৈরাচারের প্রেতাত্মারা এখনো লুকিয়ে আছে। সমাজের রন্দ্রে রন্দ্রে এরা বিচরণ করছে। তাই দেশকে স্বৈরাচারের অশুভ ছায়া থেকে মুক্ত করতে আপনাকে অনেক বেশী কঠোর হতে হবে। বাংলাদেশের প্রতিটি ক্ষেত্র দুর্নীতির মহাসাগরে নিমজ্জিত। দুর্নীতির মহাসাগর থেকে দেশকে টেনে তুলতে হলে আপনার অনেক সময়ের প্রয়োজন। আপনাকে ধৈর্য্য এবং একাগ্রতার চরম পরীক্ষা দিতে হতে পারে । কিন্তু হতাশ হবেন না। পিছপা হবেন না। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ আছে আপনার সাথে। আপনি নিশ্চয়ই সফল হবেন।
আপনার সবচেয়ে বড় কাজ হবে দোষীদের বিচার করা। এটা ভুলে গেলে চলবে না, গত পনেরো বছরে যে বা যারা হাজার হাজার মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছে, গুম করেছে, পঙ্গু করেছে, তাদেরকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করা এবং একই সাথে তার সঙ্গীসাথি যারা বাংলাদেশকে ধ্বংস করেছে, হত্যা করেছে, গুম করেছে, লুটতরাজ করেছে- তাদের প্রত্যেকটি পাপের হিসাব আপনাকেই নিতে হবে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সম্পর্কে ও কিছু কথা বলতে হচ্ছে। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান ধন্যবাদ এবং নিন্দাবাদ- দুটোই পাবার যোগ্য। তিনি যখন বুঝতে পেরেছেন, এই গণঅভ্যুত্থান সেনাবাহিনীর পক্ষে কন্ট্রোল করা সম্ভব হবে না, তখন তিনি বুদ্ধিমানের কাজ করেছেন। তিনি জনগণের কাছে নতি স্বীকার করেছেন এবং স্বৈরাচার হাসিনাকে রেড কার্ড দেখিয়ে বিদায় করেছেন।
কিন্তু একই সাথে এটাও স্বীকার করতে হবে, তিনি স্বৈরাচারকে সেইফ এক্সিট দিয়েছেন যা উচিত হয় নি। তার উচিত ছিলো শেখ হাসিনা ও তার সঙ্গীদের আটক করে বিচারের মুখোমুখি করা। কারণ তিনি তো জানেন কেনো গণঅভ্যুত্থান হয়েছিলো? হাজার হাজার মানুষকে যে হত্যা করেছে, তাকে কি সেনাবাহিনীর পাহারায় হেলিকপ্টারে করে ভারতে পালাতে দেওয়া ঠিক হয়েছে ? নিশ্চয়ই না। বরং শহীদদের রক্তের সাথে বেইমানী করা হয়েছে। এছাড়া জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান নিজেই স্বীকার করেছেন যে, তিনি সেনানিবাসে আওয়ামী লীগের পলাতক প্রায় ছয় শতাধিক মন্ত্রী এমপি ও নেতাকর্মীদের আশ্রয় দিয়েছেন। কেনো এবং কোন অধিকারে তিনি এদেরকে প্রটেকশন দিলেন? শেখ হাসিনার নির্দেশে পুলিশ এবং ছাত্রলীগ যখন দেশের সাধারণ ছাত্র ছাত্রীদেরকে নৃশংসভাবে হত্যা করছিলো, তখন তিনি কি সাধারণ ছাত্র ছাত্রীদেরকে বাচাতে এগিয়ে এসেছিলেন? তাহলে কেনো তিনি হত্যাকারীদের প্রটেকশন দিলেন? সুতরাং এই ব্যাপারে তাকেও জবাবদিহিতার মধ্যে আনতে হবে। তবে হ্যাঁ, এটা করতে গেলে ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূসকে অনেক সাহসী হতে হবে।
মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা, আপনি যাতে সেনাবাহিনীর হাতের পুতুল না হন, সেদিকে আপনাকে নজর রাখতে হবে। ভুলে গেলে চলবে না, শেখ হাসিনা শুধু এক পতিত স্বৈরশাসকই না, বরং এই সেনা প্রধানের এক নিকটাত্মীয় এবং নিয়োগদাতা।



