বাংলাদেশ

“রাজনীতিতে আবেগ নয়, দরকার মেধা ও সুশাসনের প্রতিযোগিতা”

শামসুল তালুকদার,

লেখক ও সাংবাদিক, লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাব।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে “রাজপথের ত্যাগী নেতা” ধারণাটি দীর্ঘদিন ধরেই এক বিশেষ মর্যাদা বহন করছে। যারা আন্দোলন-সংগ্রামে জীবন ঝুঁকিতে ফেলে নির্যাতন, কারাবাস ও ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাঁরা নিঃসন্দেহে দলের জন্য অমূল্য সম্পদ। তাঁদের ত্যাগের কারণে গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার অনেক সময় রক্ষা পেয়েছে, সংকটকালে তাঁরা দলে নেতৃত্বও দিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—২১ শতকের বাস্তবতায় কেবল এই ত্যাগই কি ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নির্ধারণের প্রধান মানদণ্ড হতে পারে?

বর্তমান বিশ্বে রাজনীতি কেবল স্লোগান বা রাজপথের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নয়। আজকের রাজনীতি মূলত কৌশল, জ্ঞান, প্রযুক্তি, কূটনৈতিক দক্ষতা এবং অর্থনৈতিক প্রজ্ঞার সমন্বয়ে পরিচালিত হয়। জলবায়ু পরিবর্তন, সাইবার নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি সংকট, প্রবাসী শ্রমবাজার, কূটনীতি—এসবই এখন একেকজন রাজনৈতিক নেতার দৈনন্দিন কর্মপরিধির অংশ। সুতরাং নেতৃত্ব বাছাইয়ের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোকে অতীতের সংগ্রামকে সম্মান জানালেও ভবিষ্যতের জন্য যোগ্যতা, দক্ষতা ও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন ব্যক্তিদের প্রাধান্য দিতে হবে।

এখনকার তরুণ প্রজন্ম রাজনীতি দেখে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে। তারা শুধু ঐতিহাসিক আন্দোলনের কাহিনী বা ত্যাগের গল্পে প্রভাবিত হয় না। তারা বাস্তব চায়—মানসম্মত শিক্ষা, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি-অগ্রগতি, দুর্নীতি-মুক্ত সেবা খাত, এবং বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা। তাই দলগুলো যদি তরুণ সমাজকে আকর্ষণ করতে চায়, তবে তাদের নেতৃত্বে আনতে হবে শিক্ষিত, দক্ষ, বিশ্বদৃষ্টি-সম্পন্ন নতুন প্রজন্মকে, যারা রাজনীতিকে পেশাদারিত্ব ও আধুনিকতার সঙ্গে মিলিয়ে নিতে সক্ষম।

বাংলাদেশের সেবা খাত—চিকিৎসা, শিক্ষা, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থা—যেখানে দুর্নীতি ও অদক্ষতা অনেক সময় সাধারণ মানুষের আস্থাকে ধ্বংস করেছে। তাই আগামী সরকারকে এই খাতগুলোতে অভিজ্ঞ পেশাজীবী ও সৎ নেতৃত্বকে দায়িত্ব দিতে হবে। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে জনসেবা নিশ্চিত না করলে জনগণের আস্থা ফিরবে না। দেশের মৌলিক অধিকার রক্ষায় এই খাতগুলোতে কঠোর ও স্বচ্ছ নীতি গ্রহণ অপরিহার্য।

আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ সামনে ফেব্রুয়ারির নির্বাচন। মানুষ এখনো নিশ্চিত নয়, নির্বাচন আদৌ অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হবে কি না। নির্বাচনের আগে দরকার ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা, নতুন ভোটারদের যুক্ত করা এবং বিশেষ করে প্রবাসী ভোটারদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনা—ডাকযোগে ব্যালট পাঠানো কিংবা সীমিত সক্ষমতার বিদেশি মিশন দিয়ে ভোট গ্রহণ এগুলো বাস্তবসম্মত নয় এবং উল্টো আস্থাহীনতা তৈরি করতে পারে।

প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। অথচ তাঁদের ভোটাধিকার বাস্তবে প্রায় অকার্যকর। যদি সত্যিই প্রবাসী ভোট নিশ্চিত করতে হয়, তবে দরকার নির্ভুল ভোটার তালিকা, পাসপোর্ট ও জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাইয়ের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, এবং নিরাপদ ডিজিটাল ভোটিং সিস্টেম। প্রাথমিকভাবে বিদেশি মিশনগুলো অনলাইন ফর্মের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে ডাটাবেস তৈরি করতে পারে। এভাবে প্রবাসীরা ভোটের আওতায় আসবে এবং ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন কমবে।

সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য। মৌলিক বিষয়গুলোতে আলোচনা ছাড়া কোনো টেকসই সমাধান সম্ভব নয়। নির্বাচনের আগে ও পরে সহিংসতা, সন্দেহ ও অবিশ্বাস এড়াতে হলে সরকার, বিরোধী দল এবং নির্বাচন কমিশনকে এখনই সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।

বাংলাদেশের রাজনীতির সামনে এখন একটি বড় মোড়। দলগুলো যদি সময়ের দাবি বুঝে যোগ্য নেতৃত্ব নির্বাচন করে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাস্তবসম্মত নীতি তৈরি করে এবং প্রবাসীসহ সব নাগরিকের আস্থা ফিরিয়ে আনে—তাহলেই রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আসবে। অন্যথায় আমরা আবারও পুরনো বৃত্তে আবদ্ধ থাকব, যেখানে উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও সুশাসনের অগ্রযাত্রা বারবার ব্যাহত হবে।

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

আরও দেখুন...

Close
Close