মতামত

এ যুদ্ধের দায় কি একা পুতিনের?

ভ্লাদিমির পুতিনের ইউক্রেন আক্রমণ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রতি অযাচিত হস্তক্ষেপ। যুদ্ধ কারো কাছেই কাম্য নয়। আমরা কেউ যুদ্ধ চাইনা, শান্তি চাই। কিন্তু শান্তিতো কোন স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের ভিতর থেকে আসেনা। শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হয়। আবার যুদ্ধ থামলেই শান্তি নিশ্চিত হবে এমন নিশ্চয়তাও দেয়া যায়না। যুদ্ধ অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়, কিন্তু যুদ্ধ না থামা পর্যন্ত এ সকল প্রশ্নের সঠিক উত্তর পাওয়া যায়না।

এতদিনে এটি অন্তত পরিস্কার হয়েছে, এই যুদ্ধের জন্য ইউক্রেন এবং রাশিয়া একক ভাবে দায়ী নয়। ইউক্রেনকে যারা যুদ্ধে নামিয়েছেন তারা এখন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার কৌশল নিয়ে খেলছেন। জেলেনস্কি হয়তোবা এতদিনে বুঝে ফেলেছেন এই যুদ্ধে জড়ানোটা ভুল ছিল। যদি বুঝেও থাকে তবে এতক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।

ইউক্রেনিয়ানরা নিজেদের বাড়ি-ঘর ছেড়ে ভয় আর আতংকে পালাচ্ছে দিকবিদিক। মানুষ যখন আপন ঘর ছাড়তে বাধ্য হয়, সেই কষ্টের খুব সামান্যই দৃশ্যমান থাকে। কারণ শরীরের কষ্ট দেখা যায়, মনের কষ্ট দেখা যায়না। এই অপ্রত্যাশিত যুদ্ধের কারণে লক্ষ লক্ষ ইউক্রেনিয়ানদের গৃহহীন হওয়ার কষ্ট তাদের চাইতে কেইবা বেশী জানবে? শুধুমাত্র আধিপত্ত বিস্তার আর দখলদারিত্বের জন্য যারা এই অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধকে অনিবার্য করে তুলেছেন আমরা তাদেরকে এখনো বিশ্বাস করি। সংবাদ মাধ্যমে তাদের আহ্বনে অনুপ্রাণিত হই।

এই সময়ে এক রত্তি সঠিক সংবাদের জন্য মানুষ পাগলের মত এক সংবাদ মাধ্যম থেকে আরেক সংবাদ মাধ্যমে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কারণ প্রতিটি মিডিয়া তাদের এজেন্ডা অনুযায়ী সংবাদ পরিবেশন করে। সংবাদ মাধ্যম যখন দ্বায়িত্বহীন অপপ্রচারের মাধ্যমে পরিচিতি লাভ করতে শুরু করেছে তখন সাধারণ মানুষ ছুটছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। সেখানে চলছে আরেক তেলেসমতি। সত্য-মিথ্য, ন্যায়-অন্যায় এখন মিডিয়া তেলেসমাতিতে ম্লান হয়ে গেছে। সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে যারা প্রতিনিয়ত উন্নয়ণশীল দেশের সমালোচনা করত তারাও এখন নিজেদের সুবিধা মত দেশে দেশে সংবাদ মাধ্যম খুলছে আর বন্ধ করছে।

আমরা বিশ্বাস করি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী জো বাইডেন সারা পৃথিবীর গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করবে। কথাটি শ্রুতিমধুর হলেও প্রশ্ন থেকেই যায়, সমগ্র পৃথিবীকে তিনি কেমন করে গণতান্ত্রিক করবেন? এই পৃথিবীটাকি তার এবং তার পূর্ব পুরুষের জমিদারী? যুক্তরাষ্ট্র অথবা তার তাবেদাররা হয়তো তাই মনে করে। ইউক্রেন যুদ্ধে কোন দেশ কাকে সমর্থন দেবে বা দেবেনা সেটি তাদের আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। অথচ আমেরিকা এবং ন্যাটোকে সমর্থন না দিলেই সেই সকল দেশের গণতন্ত্র নিয়ে প্রশ্ন উঠে। পশ্চিমা প্রচার যন্ত্র ইকনোমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট অগ্রিম বিরোধীদের গণতন্ত্রের সূচক প্রকাশ করে। পূর্ণ গণতন্ত্র, ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র, হাইব্রিড রেজিম ও স্বৈরতন্ত্রর নামে শ্রেণীবিন্যাস করে।

জেলেনস্কি কৌতুক অভিনেতা থেকে রাষ্ট্রপতি হয়েছেন। এমন অবজ্ঞা অনেকেই দেখান। কৌতুক অভিনেতা রাষ্ট্রপতি হতে পারবেননা এমন নিয়মতো কোথাও নেই। এবং রাষ্ট্রপতি অভিনয় করলেও কারো মর্যাদা বিনষ্ট হবার কথা নয়। শুনতাম আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জিমি কাটার বাদাম বিক্রেতা ছিলেন। ইন্ডিয়ার রাষ্ট্রপতি নরেন্দ্র মোদি রেলের বগিতে চা বেচতেন। শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট রানাসিংগে প্রেমাদাসা বুট-বাদামের ফেরিওয়ালা ছিলেন। অতীত দিয়ে কাউকেই বিচার করা ঠিক নয়। গৌতম বুদ্ধ আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গেছেন, ”মানুষকে তার অতীত দিয়ে বিচার করোনা, মানুষ শেখে, মানুষ বদলায়, মানুষ এগিয়ে যায়”।

যে যুদ্ধে কেউই জিতবেনা সেই যুদ্ধে জড়ানো বোকামী, আর যেই যুদ্ধে পরাজয় নিশ্চিত সেই যুদ্ধে জড়ানো আত্মবিধ্বংসী। সেই ক্ষেত্রে জেলেনস্কি কি আত্মবিধ্বংসী যুদ্ধেই জাড়ালেন! কার ভরসায় তিনি রাশিয়ার মত এত বড় পরাশক্তির মুখোমুখী দাঁড় করিয়ে দিলেন তার দেশের শান্তি প্রিয় সাধারণ জনগনকে? কার উপর ভরসা করে পারমানবিক শক্তিধর রাশিয়ার সামনে দাঁড় করিয়ে দিলেন তার দেশের স্বশস্ত্রবাহিনীকে?

দেশ প্রেম কখনো ব্যক্তিগত রোমাঞ্চ হতে পারেনা। অথচ জেলেনস্কির ব্যক্তিগত রোমাঞ্চের মূল্য দিচ্ছে ইউক্রেনের লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষ। যুদ্ধ যে দেশের উপর দিয়ে যায় তারাই জানে যুদ্ধের ভয়াবহতার ক্ষত শত বছরেও কাটিয়ে উঠা যায়না। জেলেনস্কির উপর আস্থা রেখে যারা একজন অভিনেতাকে রাষ্ট্রপতি বানিয়েছেন, সেই রাষ্ট্রপতির রাজনৈতিক ভুলের খেসারত দিতে লক্ষ মানুষ আজ ঘর ছাড়া। কার প্ররোচনায় যুদ্ধে জড়িয়ে লক্ষ মানুষকে শরণার্থীতে পরিণত করেছেন জেলেনস্কি। স্বশস্ত্র বাহিনীর সদস্যসহ হাজারো মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। ধ্বংস হয়ে গেছে এয়ারপোর্ট, রাস্তা-ঘাট, ব্যবসা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আর হাজারো বাড়ি-ঘর। জেলেনেস্কি ডিজিটাল মিডিয়ায় দুটো বক্তব্য দিয়ে জনগনকে আবেগপ্রবণ করে সাময়িক সান্তনা দেবার চেষ্টা করছেন।

গত এক দশকেরও বেশী সময় ধরে রাশিয়ার সকল ধরনের আপত্তি উপেক্ষা করে যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটো জোট তাদের সদস্যা সংখ্য বাড়িয়েই চলেছে। বর্তমানে ন্যাটোর সদস্য সংখ্যা ৩০, তাতেও তারা সন্তুষ্ট নয়। সেই অসন্তুষ্টির আগামীর সংযোজন হওয়ার কথা ছিল ইউক্রেনের। ইউক্রেনকে ন্যাটোর সদস্য করার আগেই যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো ইউক্রেনকে উন্নত অস্ত্র সরবরাহ করা শুরু করেছে। এ কারণে রাশিয়ার উদ্বেগের সীমা নাই। ইউক্রেনকে ন্যাটোর সদস্যা না হতে রাশিয়া বার বার অনুরোধ করছিলো। কারণ ইউক্রেন ন্যাটোর সদস্য হলে রাশিয়ার ভবিষ্যত কি হবে সেটা বুঝতে পুতিনের মত রাজনৈতিক দূরদর্শী একজন নেতার বেশী কাঠখড় পোড়াতে হয়নি।

ইউক্রেন ন্যাটোর সদস্য হলে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রিত ক্রিমিয়ার মত গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক শহর এবং বন্দর রাশিয়ার হাত ছাড়া হয়ে যেতে পারে। রাশিয়া এবং ইউক্রেনের দীর্ঘতম রাষ্ট্রীয় সীমানায় ন্যাটো বাহিনী ইচ্ছামত স্থায়ী সামরিক স্থাপনা প্রতিষ্ঠা করবে। যেটি রাশিয়ার স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকির কারণ হতে পারে। পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তর পারমানবিক স্থাপনা চেরানবিল আবার প্রাণ ফিরে পাবে। ইউক্রেনের সাথে রাশিয়ার চলমান আর্থ-সামাজিক ও বানিজ্যিক সম্পর্ক ব্যাহত হবে। সর্বোপরি রাশিয়ার উপর ন্যাটোর সম্ভাব্য হামলা ঠেকাতে রাশিয়ার সামরিক ব্যয় বহুগুণ বাড়াতে হবে। তবুও এই সকল বিষয় বিবেচনায় পুতিনের ইউক্রেন আক্রমন বৈধ হয়ে যায়না। কারণ ভবিষ্যতের আশংকা করে কোন স্বাধীন সার্বভৌম দেশকে এ ভাবে নিগ্রহ করা গ্রহণযোগ্য নয়। ভূরাজনীতির ভবিষ্যত সমিকরণকে সামনে এনে কোন ধরণের যুদ্ধকেই সমর্থন করা যায়না।

পুতিনের ইউক্রেন আক্রমনকে সমর্থন করলে যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটো জোটের সাদ্দাম হঠানোর নামে ইরাক আক্রমণ এবং নারী-শিশুসহ লক্ষ লক্ষ মানুষ হত্যার বিরোধীতা করা যায়না। রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণকে সমর্থন করলে আরব বসন্তের নামে, গনতন্ত্র উদ্ধারের নামে, সন্ত্রাস দমনের নামে, স্বৈরশাসনের অবসানের নামে যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটো জোট সিরিয়া, লিবিয়া, আফগানিস্তান, ফিলিস্তিন এবং ইয়েমেনে যে নারকীয়তা চালিয়েছে বা চালাচ্ছে এর প্রতিবাদও করা যাবে না।

বিশ্বের পরাশক্তির ভারসাম্যহীনতার কারণে যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটো জোটের কাছে জিম্মি হয়ে গেছে পুরো বিশ্ব। এই বিশাল দানবীয় শক্তির বিরুদ্ধে কথা বলার এক মাত্র শক্তি রাশিয়া, সেই রাশিয়াও কি এখন যুক্তরাষ্ট্র্র এবং ন্যাটোর পদাংকই অনুস্বরণ করলো না? পরাশক্তিরা যুদ্ধের নামে, শিল্প বিপ্লবের নামে, শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে পৃথিবীকে প্রায় ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে নিয়ে গেছে।

বহুদিন আগে ভ্লাদিমির পুতিন সবাইকে স্বরণ করিয়ে দিয়ে বলেছিলেন,”যুদ্ধ যদি অনিবার্য হয় তবে সর্বাগ্রে তোমাকেই আঘাত হানতে হবে”। পুতিনের কথা মত তাহলে কি এই যুদ্ধ অনিবার্য ছিল? কে এই যুদ্ধকে অনিবার্য করে তুলল। যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটো জোট নাকি রাজনীতিতে অদূরদর্শী ও অনভিজ্ঞ রাষ্ট্রপতি ভলোদিমির জেলেনস্কি? এ যুদ্ধটি কে করছে কার সাথে? ইউক্রেন বনাম রাশিয়া নাকি যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটো জোট বনাম রাশিয়া?

তবে এবারের যুদ্ধে যদি পুতিন জিতে যায় তবে হারবে ইউক্রেন। আর যদি পুতিন হেরে যায় তবে হেরে যাবে সমগ্র বিশ্ব। সেই হারের পরিণতি হতে পারে তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধ!

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Close