মতামত
দুর্নীতির কাছে পরাজিত হলেন শরীফ উদ্দিন!

|| হাসান রহমান ||
দুর্নীতি দমন কমিশনের চাকুরিচ্যুত সাবেক কর্মকর্তা শরীফ উদ্দিনের মনের অবস্থা আমরা না জানলেও অনুমান করেই বলছি। শরীফ উদ্দিন এখন আত্মগ্লানীতে ভুগছেন। লক্ষ লক্ষ বেকারের দেশে এমন মর্যাদাপূর্ণ একটি চাকুরী হাত ছাড়া হওয়ার কষ্ট সহ্য করা সহজ কথা নয়। তার চাকুরিচ্যুতির প্রতিবাদে সহকর্মীরা রাস্তায় নামেছেন, কিছু বিবেকবান মানুষ প্রতিবাদ জানিয়েছেন, জাতীয় আন্তর্জাতিক পত্রিকা এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাকে নিয়ে লেখা হচ্ছে। এতে করে শরীফ উদ্দিনের খুব বেশী লাভ হবে বলে মনে হয়না। কারণ সচিব মহোদয় বলে দিয়েছেন শরীফ উদ্দিন দুদকের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করেছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের ভাবমূর্তি আমাদের কাছে সব সময় বিমূর্ত, তাই এ বিষয়ে মন্তব্য করা মুসকিল। একটু ইতিহাসের দিকে চোখ ঘুরালেই দেখতে পাই, ২০০৪ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন পাস হওয়ার কিছু আগে থেকে বাংলাদেশ দুর্নতিতে ক্রমাগত বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হচ্ছিল। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের সেই সময়কার দুর্নীতির রিপোর্টে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা সরকার বিব্রত হয়ে এই কমিশন গঠন করে। অবশ্য দুর্নীতি দমন কমিশন গঠিত হবার পর থেকে দুর্নীতিতে বাংলাদেশের সূচক কিছুটা কমতে শুরু করে। সে কারণে বাংলাদেশের দুর্নীতি দমনে কমিশনের অবদানকে কিছুটা সাধুবাদ দেয়াই যায়। তবে ততকালীন সময়ে বুদ্ধিজীবিরা বলতেন, ”বাংলাদেশের দুর্নীতি মোটেও কমেনি বরং অন্যান্য দেশের দুর্নীতি বৃদ্ধির কারনে বাংলাদেশ কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে”।
বাংলাদেশ এখনো বিশ্বে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন দেশের তালিকার প্রথম দিকেই আছে। সুতরাং দেশের দুর্নীতি দমন কমিশন কতটা কার্যকর সেটা বুঝার জন্য প্রতিবছরের দুর্নীতির সুচক বিষয়ক রেকর্ড দেখাই যথেষ্ট।
সরকারের সাবেক এক মন্ত্রী বলেছিলেন, ‘ঘুষ হচ্ছে স্পিড মানি’। মন্ত্রী মহোদয়ের এমন মন্তব্যের পর ঘুষ খোরেরা একধরনের আত্মবিশ্বাস পায়। বর্তমানে বাংলাদেশে ঘুষ খাওয়া পাপ হলেও অপরাধ হিসেবে গণ্য করার সুযোগ অনেক কম। শুনেছি শরীফ উদ্দিন দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপষহীন এবং নির্ভিক। তার চট্টগ্রামের বাসায় এসে গ্যাস কোম্পানির কর্মকর্তরা চাকুরিচ্যুতি এবং মৃত্যু ভয় দেখালেও তিনি সেসবে গা করেননি। শরীফ উদ্দিন ধরেই নিয়েছেন, চট্টগ্রামে চলমান ৭২টি প্রকল্পের সাড়ে ৩ লাখ কোটি টাকার কাজ যথাযথ নিয়ম মেনেই হবে। জনগণের ট্যাক্সের প্রতিটি অর্থ জনগণের জন্যই ব্যয় হবে। দেশের প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতিতে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছেন। অতএব, কোন ধরনের দুর্নীতি সহ্য করা যাবে না। শরীফ উদ্দিন ধরেই নিয়েছেন, দুর্নীতি দমন কমিশনের একজন কর্মকর্তা হিসেবে উর্ধতন কর্মকর্তাদের কাছ থেকে সার্বিক সহযোগিতা পাবেন। কিন্তু সেই সহযোগিতা যে চাকুরিচ্যুতির মাধ্যমে সমাপ্ত হবে সেই ধারনা তার ছিল বলে মনে হচ্ছে না।
শুনেছি শরীফ উদ্দিনকে উপসহাকরী পরিচালকের পদ থেকে যথাযথ নিয়ম মেনে চাকুরীচ্যুত করা হয়নি। এমনকি তার অপরাধও কোথাও ¯পষ্ট করে উল্লেখ্য করেননি তার উর্ধতন কর্মকর্তারা। দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার দৃঢ় অবস্থানের কারনে প্রথমে তাকে বদলি করা হয় চট্টগ্রাম থেকে পটুয়াখালী। এতেও দুর্নীতিবাজ গোষ্ঠি নিরাপদ বোধ করেনি। যার সর্বশেষ প্রতিশোধ নিল শরীফ উদ্দিনকে চাকুরীচ্যুতির মাধ্যমে। অথচ শরীফ উদ্দিনের মত বিরল প্রজাতির সৎ ও নিষ্ঠাবান সরকারী কর্মকর্তার প্রচ- অভাব আছে বাংলাদেশে। এই অভাব শুধু তারাই জানেন, যারা অন্তত একবার হলেও সরকারী কোন অফিসে গেছেন কোন ধরনের কাজের জন্য।

প্রতিদিন পত্রিকার পাতা সয়লাব থাকে দেশের দুর্নীতির খবরে। দুর্নীতি দমন কমিশনের মধ্যকার দুর্নীতির প্রতিবেদনও মানুষকে হতাশ করে। কারণ সর্ষের ভিতরেই যখন ভুত থাকে তখন সেই সর্ষে দিয়ে ভুত ছাড়ানো কত কঠিন সেটা ওঝারাই ভাল জানেন। হাজারো দুর্নীতির মাঝেও শরীফ উদ্দিনরাই মানুষের আশার বাতিঘর। সেই পিদিম যখন ঝড়ের তোড়ে নিভে যায় তখন দুর্নীতি মুক্ত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হওয়ার ক্যালেন্ডারের তারিখ আরো লম্বা হতে থাকে। আর এরই মধ্যে গুটিকয়েক ব্যক্তির লোভের পাহাড় দুর্নীতির মাধ্যমে আরো উঁচুতে উঠে যায়। বেড়ে যায় উন্নয়নের বৈষম্য, ফলাফলস্বরূপ দেশের উন্নয়নের ফসল সবাই ভোগ করতে পারেনা। উন্নয়ন চলে যায় পোস্টারের পাতায় আর রাজনীতিকদের গলাবাজিতে।
শরীফ উদ্দিন খেয়ালই করেননি তার মত সৎ এবং দেশ প্রেমিক সরকারী কর্মকর্তারা বিভিন্ন সময়ে উর্ধতন কর্মকর্তাদের মাধ্যমে কি ধরেন বৈসম্যের স্বীকার হচ্ছেন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিজান পরিচালনাকারী ম্যাজিস্ট্রেটদের কিভাবে কোনঠাসা করা হয়েছে। শরীফ উদ্দিন সেই সকল ঘটনা থেকে কেন শিক্ষা নিলেন না? চাকুরীর এই দুর্মূল্যের বাজারে এ বয়সে এসে অরেকটি চাকুরী যোগাড় করা তার মত নিষ্ঠাবান একজন কর্মকর্তার হয়তোবা খুব কঠিন হবেনা। কিন্ত তার মনে যে ক্ষত তৈরী হয়েছে, সমগ্র জাতির কাছে দুর্নীতি দমন কমিশনের যে ভাবমূর্তি তৈরী হয়েছে সেটা বড়ই হতাশার। শরীফ উদ্দিনের এই ঘটনার পর থেকে কমিশনের অন্যান্য কর্মকর্তারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কোন ধরনের উচ্চ-বাচ্য করতে সাহস করবে বলে মনে হয়না।
তবে আশার কথা এত দুর্নীতি এত অনিয়মের মাঝেও দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। শহরের পরিধি বড় হচ্ছে, জিডিপি বাড়ছে, বৈদেশিক মুদ্রার তহবিল ক্রমাগত বড় হচ্ছে, খাদ্য উৎপাদনে দেশ স্বংসম্পূর্ন হচ্ছে। একসময় হয়তোবা দুর্নীতিও কমবে। একদিন শরীফ উদ্দিনরা নির্ভয়ে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নিবে। একদিন উন্নয়নের সুফল সমান ভাবে ভোগ করবে প্রতিটি নাগরিক। একদিন সবাই সগৌরবে অনুভব করবে এই দেশই আমার মাতৃভূমি।
হাসান রহমান, সাংবাদিক ও মানব উন্নয়ন কর্মী



