শিক্ষাঙ্গন

বিদেশে উচ্চশিক্ষা: সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের পথ

নতুনদিন প্রতিনিধিঃ সৈয়দ আনোয়ার রেজা,

বর্তমান বাংলাদেশে শিক্ষার প্রতি মানুষের আগ্রহ ও সচেতনতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধু দেশে নয়, অনেকেই এখন ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে আসছেন। অভিভাবকেরাও সন্তানদের ভবিষ্যৎ নির্মাণে দিনরাত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবুও, তথ্যের অভাব, পরিকল্পনার ঘাটতি এবং প্রাসঙ্গিক দিকনির্দেশনার সংকটে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণে পিছিয়ে পড়ছেন। এ সুযোগে প্রতিবেশী দেশগুলো, যেমন ভারত, চীন, শ্রীলঙ্কা এবং ভিয়েতনাম তাদের শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উন্নতির ক্ষেত্রে এগিয়ে নিচ্ছে।

বাংলাদেশে বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের প্রক্রিয়া মূলত উচ্চ মাধ্যমিক স্তর পেরোনোর পর শুরু হয়। শিক্ষার্থীরা সাধারণত আন্ডারগ্রাজুয়েট, পোস্টগ্রাজুয়েট, কিংবা পিএইচডি পর্যায়ে পড়াশোনার জন্য পাড়ি জমান। তবে এটি সবার জন্য সহজ পথ নয়। বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেতে শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক মানের একাধিক প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হয়। IELTS, TOEFL, GRE, GMAT, এবং SAT—এসব পরীক্ষায় ভালো স্কোর অর্জন প্রায় বাধ্যতামূলক। বিশেষ করে, ইংরেজি দক্ষতা যাচাইয়ের জন্য আইইএলটিএস (IELTS) পরীক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম।

আইইএলটিএস (The International English Language Testing System) পরীক্ষাটি ইংরেজি ভাষার ওপর দক্ষতা যাচাইয়ের একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃত পদ্ধতি। যারা ইংরেজিভাষী দেশগুলোতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে চান, তাদের জন্য এটি একটি অপরিহার্য শর্ত। শিক্ষার্থীদের জন্য এই পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সিলেট সরকারি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করা শিক্ষার্থী আমিনা ফারহা আনিকার অভিজ্ঞতা এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাজ্যে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে আইইএলটিএস প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য তিনি শাহ সুলতান আইইএলটিএস একাডেমিতে ভর্তি হন। তিনি জানান, এখানকার ছোট ব্যাচভিত্তিক ক্লাস তার শেখার প্রক্রিয়াকে অনেক সহজ করেছে। ১৫ জনের বেশি শিক্ষার্থী না থাকায় প্রত্যেকেই পর্যাপ্ত মনোযোগ পেয়েছেন। শিক্ষকদের বন্ধুসুলভ আচরণ এবং সহায়তার মনোভাব তাকে আত্মবিশ্বাসী হতে সাহায্য করেছে।

অন্যদিকে, সিলেট পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী এফছানুল রহমান সোহাগ বলেন, ক্লাসে কোনো বিষয় বুঝতে সমস্যা হলে শিক্ষকেরা ক্লাসের বাইরেও সাপোর্ট দেন। এটি তার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত সহায়ক হয়েছে।

তবে সব প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা সমান ইতিবাচক নয়। দক্ষিণ সুরমা সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী শেখ ইবাদুল হকের মতে, কিছু প্রতিষ্ঠানে সেবার মান যথেষ্ট নয়। উচ্চ ফি নেয়ার পরও প্রযুক্তিগত সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় শিক্ষার্থীদের। বসার পরিবেশ অনুন্নত, সময়সূচী অসঙ্গতিপূর্ণ, এমনকি ওয়াশরুমের ব্যবস্থাও অনেক জায়গায় অপ্রতুল। তার মতে, এসব ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের জন্য একটি সুষ্ঠু ও উন্নত মানের পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।

বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মেধার পরিপূর্ণ বিকাশ এবং তাদের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাফল্যের পথ সুগম করতে সঠিক পরিকল্পনা এবং উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রথমত, IELTS এবং অন্যান্য প্রস্তুতিমূলক প্রতিষ্ঠানে সেবার মান নিশ্চিত করতে হবে। ছোট ব্যাচভিত্তিক ক্লাস, দক্ষ শিক্ষক, উন্নত প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং ন্যায্য ফি কাঠামো শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, সরকার এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর যৌথ প্রচেষ্টায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণের তথ্যসেবা সহজলভ্য করতে হবে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস বাড়াতে অনুপ্রেরণা এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান জরুরি।

বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা জন্মগতভাবে মেধাবী এবং উচ্চশিক্ষার প্রতি আগ্রহী। সঠিক পরিবেশ, নির্দেশনা এবং প্রণোদনা পেলে তারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করতে সক্ষম। এখন প্রয়োজন কেবল সেবার মানোন্নয়ন এবং বৈশ্বিক শিক্ষার পথে বাধাগুলো অপসারণ।

সত্যিকার অর্থে, এই উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন আর দূরের কিছু থাকবে না।

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Close