প্রবাস

লিডসে কাব্যশীলনের বসন্তবরণ

শীতের আবরণ সরিয়ে বসন্তের স্নিগ্ধ আগমনে লিডসে হয়ে গেল বিপুল বর্ণময় ও এক আদ্যোপান্ত উপভোগ্য বসন্তবরণ উৎসব। সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠন কাব্যশীলন-এর উদ্যোগে গত শনিবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) লিডসের মূরটাউন মেথডিস্ট চার্চ মিলনায়তনে আয়োজিত হয় এ উৎসব। সংগীত, নৃত্য, আবৃত্তি, শ্রুতি-আলেখ্য – বিচিত্র সব শিল্পের সম্মোহনী মঞ্চায়ন চলতে থাকে পুরো সন্ধ্যা|

প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টার এ অনুষ্ঠানে লিডস ও আশপাশের শহর থেকে ভ্যানু উপচে পড়া বিপুল সংখ্যক বাঙালি ও অবাঙালি দর্শক-সমাগম পুরো আয়োজনকে আরো প্রানবন্ত আরো সার্বজনীন করে তোলে।

অনুষ্ঠানের অন্যতম বিশেষ আকর্ষণ ছিলেন ইউক্রেনের জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সংগীতশিল্পী ও বান্দুরা বাদক একা।

উৎসবে বাংলাদেশ, ভারত, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের শিল্পীদের সম্মেলনে সূচিত হয় এক সত্যিকার বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক আবহ।

লিডসের প্রখ্যাত উপশাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী সুমনা বসু, সংগীতশিল্পী সৈয়দ হাসান, ওড়িশি নৃত্যশিল্পী জয়তী পাল, ধ্রুপদী ও লোকনৃত্যশিল্পী সুমাইয়া ইমাম সুচিতা ও অর্জিতা দাশ – তাঁদের পরিবেশনায় দর্শকদের মুগ্ধ করেন।

সৌধ-এর পরিচালক কবি টি এম আহমেদ কায়সার বসন্তবরণ উৎসবের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন,
বসন্তবরণের আয়োজন দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিককে তুলে ধরে। প্রথমত, এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক আয়োজন, যা বাংলা সংস্কৃতিকে বিশ্বমঞ্চে উপস্থাপন করে। দ্বিতীয়ত, এটি শুধুমাত্র ঋতুর পরিবর্তনের উদযাপন নয়, বরং এক জীবনঘনিষ্ঠ উৎসব। বসন্ত মানেই তারুণ্যের উদ্দীপনা, প্রাণের উচ্ছ্বাস এবং রঙের বৈচিত্র্য। কাব্যশীলন যে এ ধরনের একটি ব্যতিক্রমী ও সৃজনশীল আয়োজন করেছে, তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।

এই অসামান্য সাংস্কৃতিক আয়োজনে অংশগ্রহণ করেছেন বৃটেনের শিল্প ও সাহিত্য মন্ডলের প্রথিতযশা কুশীলববৃন্দ। বিচিত্র সব পরিবেশনায় অংশ নেন লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ প্রভাষক ড. মাট প্রিটচার্ড, লেখক ক্রিস্টিন কামেন্সিকোভা, কবি ও গল্পকার শ্রী গাঙ্গুলী, চিত্রশিল্পী ও আবৃত্তিকার নাজিয়া আমিন, আবৃত্তিশিল্পী সামান্তা ওয়াকার, নাজমা ইয়াসমিন, মিতুল ইফফাত, ডা. পাম ঘোষ, ডা. কানিজ ফাতেমা চৌধুরী, ডা. শারমীন নিজাম।

উত্তর ইংল্যান্ডের দুই প্রধান সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘আলোড়ন’ ও ‘পূরবী’-র প্রতিনিধিরাও অংশ নেন বিভিন্ন আয়োজনে। শিশুশিল্পী শ্রীয়াসি ভট্টাচারিয়া, আদিশ্বর ও প্রজ্ঞার অপূর্ব পরিবেশনা দিয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করে রাখেন।

কাব্যশীলনের নির্বাহী সম্পাদক সৈয়দ আনোয়ার রেজা বলেন,
বাংলা সংস্কৃতি এখন আর কেবল বাঙালিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি এখন বিশ্বসংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। বসন্তবরণ উৎসবের মাধ্যমে আমরা সংস্কৃতির সৌন্দর্য, প্রাণচঞ্চলতা ও উজ্জ্বলতাকে উদযাপন করে মানুষের হৃদয়ে স্পন্দন জাগানোর চেষ্টা করেছি।

তিনি আরও বলেন,
“কাব্যশীলন ভবিষ্যতেও বাংলা সংস্কৃতির বিকাশ ও প্রসারে এমন সৃজনশীল উদ্যোগ গ্রহণ করবে। এই আয়োজন সফল করতে যাঁরা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন, তাঁদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই।

প্রাণবন্ত পরিবেশনা ও আবেগময় মুহূর্তগুলোর জন্য এই উৎসব দর্শকদের হৃদয়ে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এক সন্ধ্যায় সংগীত, নৃত্য, কবিতা, সাহিত্য ও শিল্পের এক অনবদ্য সংমিশ্রণ প্রত্যক্ষ করেছেন লিডসবাসী।

বসন্ত যেমন প্রকৃতিতে নিয়ে আসে নতুন রঙ, তেমনি কাব্যশীলনের এই আয়োজন দর্শকদের হৃদয়ে এক অনন্য রঙের ছোঁয়া দিয়ে গেল। বাংলা সংস্কৃতি যে বিশ্বজনীন—সেই বার্তাই তুলে ধরল কাব্যশীলন।

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Close