লাইফস্টাইল

মেনোপজ: জীবনের একটি প্রাকৃতিক পরিবর্তন — নারীর সুস্থ ভবিষ্যতের দিকে এক পদক্ষেপ

হাফসা নুর,
প্রতিবেদন: স্বাস্থ্য ডেস্ক
নারীর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো **মেনোপজ**, যা শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের এক স্বাভাবিক অংশ। এটি কোনো রোগ নয়, বরং প্রজননক্ষমতার পরিসমাপ্তি ও জীবনের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা। অনেকেই এই পর্যায় নিয়ে বিভ্রান্ত বা অজ্ঞাত থাকেন, অথচ প্রয়োজন সচেতনতা ও সঠিক জ্ঞান।

### **মেনোপজ কী এবং কখন ঘটে?**

মেনোপজ হলো সেই সময়কাল, যখন একজন নারীর ঋতুচক্র চিরতরে বন্ধ হয়ে যায় এবং তিনি আর প্রাকৃতিকভাবে সন্তান ধারণে সক্ষম নন। সাধারণত এটি ৪৫ থেকে ৫৫ বছর বয়সের মধ্যে ঘটে, তবে কারও ক্ষেত্রে তা আগে বা পরে হতে পারে। মাসিক বন্ধ হওয়ার আগে যে সময়টিকে পেরিমেনোপজ বা মেনোপজ-সংক্রান্ত রূপান্তরকাল বলা হয়, সেটিতে দেখা দেয় নানা উপসর্গ ও পরিবর্তন।

### **উপসর্গ: প্রতিটি নারীর অভিজ্ঞতা আলাদা**

মেনোপজের লক্ষণগুলো নারিভেদে ভিন্ন হতে পারে। কারো উপসর্গ মৃদু, আবার কারো ক্ষেত্রে তা দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করতে পারে। সাধারণ উপসর্গগুলোর মধ্যে রয়েছে:

* হঠাৎ গরম অনুভব (হট ফ্ল্যাশ) ও ঘাম
* ঘুমের ব্যাঘাত
* যৌন অস্বস্তি ও যোনি শুষ্কতা
* মেজাজ পরিবর্তন ও মনঃসংযোগের ঘাটতি
* স্মৃতি বিভ্রাট
* ওজন বৃদ্ধি ও শারীরিক গঠনের পরিবর্তন
* প্রস্রাবের সমস্যা ও ইনফেকশনের ঝুঁকি

এগুলো দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

### **হরমোনের প্রভাব এবং শরীরের পরিবর্তন**

এই সময়ে নারীর দেহে ইস্ট্রোজেন ও প্রজেস্টেরনের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এই হরমোন পরিবর্তনের ফলেই দেখা দেয় উপসর্গগুলো। এছাড়া বেশ কিছু স্বাস্থ্যঝুঁকিও দেখা দিতে পারে:

* বিপাক হার কমে যায়, ফলে সহজেই ওজন বাড়ে
* পেটের চারপাশে চর্বি জমা হয়
* হাড় ক্ষয় ও অস্টিওপোরোসিসের সম্ভাবনা
* হৃদরোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি
* পেশি শক্তি হ্রাস

ধূমপান, খাদ্যাভ্যাস, বংশগতি ও জাতিগত বৈশিষ্ট্য এ পরিবর্তনের মাত্রাকে প্রভাবিত করে।

### **কীভাবে বুঝবেন মেনোপজ শুরু হয়েছে?**

৪৫ বছরের ঊর্ধ্বে কেউ অনিয়মিত মাসিক, ঘাম, ঘুমের সমস্যা বা মেজাজের পরিবর্তন লক্ষ্য করলে মেনোপজ শুরু হয়েছে কি না, তা বুঝতে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। অনেক সময় হরমোন পরীক্ষার মাধ্যমেও নিশ্চিত হওয়া যায়।

যদি কোনো কারণে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ডিম্বাশয় অপসারণ করা হয়, তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে মেনোপজ শুরু হতে পারে — যাকে বলা হয় সার্জিকাল মেনোপজ।

একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো: শেষ মাসিকের পরও অন্তত এক বছর পর্যন্ত গর্ভধারণের সম্ভাবনা থেকে যায়, তাই জন্মনিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা দরকার।

### **মেনোপজ মোকাবেলায় করণীয়**

মেনোপজ ব্যবস্থাপনার জন্য একেক জনের জন্য একেক রকম সমাধান কার্যকর হতে পারে। মূলত উপসর্গের তীব্রতা ও স্বাস্থ্য অবস্থার উপর ভিত্তি করে চিকিৎসা নির্ধারণ করা হয়:

* **হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি (HRT):** হট ফ্ল্যাশ ও যোনি শুষ্কতার উপসর্গে অত্যন্ত কার্যকর। তবে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকায় চিকিৎসকের নির্দেশে গ্রহণ করা উচিত।
* **নন-হরমোনাল ওষুধ:** যারা HRT নিতে চান না বা পারেন না, তাদের জন্য বিকল্প ওষুধ রয়েছে।
* **জীবনধারায় পরিবর্তন:** নিয়মিত ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ ও পর্যাপ্ত ঘুম অপরিহার্য।
* **পুষ্টি সাপ্লিমেন্ট:** হাড় মজবুত রাখতে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি গ্রহণ উপকারী।

### **সমর্থন ও সচেতনতার গুরুত্ব**

মেনোপজ কোনো রোগ নয়, এটি জীবনের স্বাভাবিক ধাপ। তবে এর প্রভাব গভীর ও বহুমাত্রিক হতে পারে। পরিবার, সমাজ ও কর্মক্ষেত্রে নারীদের জন্য সহানুভূতিশীল পরিবেশ গড়ে তোলা জরুরি। পরিবর্তনগুলোকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ ও সহযোগিতা করলে একজন নারী এই অধ্যায়ে প্রবেশ করতে পারেন আত্মবিশ্বাস ও সম্মানের সঙ্গে।

**শেষ কথা**

মেনোপজ মানেই জীবনের সমাপ্তি নয়, বরং নতুনভাবে জীবনকে দেখার সুযোগ। নিজের শরীরকে জানা, প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া এবং যত্ন নেওয়ার মাধ্যমেই নারীরা এই পরিবর্তনের সময়টিকে সুস্থ ও স্বাচ্ছন্দ্যে কাটাতে পারেন।

মেনোপজকে ভয় নয় — বরং জ্ঞান, সচেতনতা ও যত্নের মাধ্যমে এই অধ্যায় হোক জীবনের একটি সুন্দর নতুন সূচনা।

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

আরও দেখুন...

Close
Close